দেশের পর্যটন শহর কক্সবাজার। এখানকার বাঁকখালী নদীর দখল চলছে নির্বিচারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও নামে-বেনামে নদী দখল করে তৈরি হচ্ছে স্থাপনা। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিরাও দখল করেছেন নদীটি। দখলের তালিকায় উঠেছে খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের নামও।

২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নদী দখলের তালিকা প্রস্তুত ও দখলমুক্ত করতে কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু অজানা কারণে নদীর তীর দখলমুক্ত করতে পারেনি সংস্থাটি। সর্বশেষ ২০২১ সালের শেষদিকে বিআইডব্লিউটিএ বাঁকখালী নদী দখলদারদের নতুন তালিকা প্রণয়ন করে। ওই তালিকায় প্রভাবশালী ১৩১ দখলদারের মধ্যে ১৩০ নম্বরে রয়েছে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের নাম। পরিবেশ রক্ষায় কাজ করা সরকারি প্রতিষ্ঠানটি নদী ও নদীতীরবর্তী ৫০ শতক জমি দখল করেছে। দখলকৃত জায়গায় স্থানীয় পরিবেশ অধিদপ্তর পাকা দালান ছাড়াও টিনশেডের ঘর নির্মাণ করে রেখেছে।

যদিও দখলের বিষয়টি মানতে নারাজ পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, সরকারি কাজের প্রয়োজনীয়তা ও পরিবেশ রক্ষায় চলমান প্রকল্পের জন্যই নদীতীরবর্তী অংশে ঘর ও টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। তবে নদীর তীরভূমি দখল করে ব্যবহারের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে অনুমোদন নিয়েছে কিনা সে বিষয়ে কিছুই জানাতে পারেননি কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে বাঁকখালী নদীর তীর ও প্যারাবন কেটে ফেলে পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে মামলা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। কস্তুরাঘাটের বাঁকখালী নদীর তীরে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘কোস্টাল অ্যান্ড ওয়েটল্যান্ড বায়োডাইভার্সিটি প্রকল্প’ কর্তৃক সৃষ্ট কয়েকশ একর প্যারাবনের প্রায় ১৫ হাজার গাছ কেটে প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট ও ভরাটকৃত স্থানে ঘর নির্মাণের অভিযোগে ২ ডিসেম্বর কক্সবাজার মডেল থানায় এ মামলা দায়ের করা হয়। অথচ বিআইডব্লিউটিএ বলছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প এলাকা ও প্রকল্প অফিসসংলগ্ন এলাকাগুলো নদী ও নদীর তীর দখল করে তৈরি করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এতে সরকারি কোনো সংস্থার অনুমোদন নেয়া হয়নি বলে দাবি বিআইডব্লিউটিএর।

বাঁকখালী নদী দখলের বিষয়টি অস্বীকার করেন কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুল হুদা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নদী দখলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো সংস্থাই দখলের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে অভিযোগ দেয়নি। তাছাড়া নদীতীরবর্তী একটি বায়োডাইভার্সিটি প্রকল্পের প্রয়োজনে নদীতীরবর্তী একটি অংশে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নদী দখল কিংবা পরিবেশ দূষণের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন তিনি। 

পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রভাবশালীদের দ্বারা বাঁকখালী নদী দখলের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বণিক বার্তাকে বলেন, বাঁকখালী নদীর অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে উচ্ছেদ ও জেলা প্রশাসনের কাছে ফোরশোর ম্যাপ অনুযায়ী নদীতীরবর্তী ভূমি বিআইডব্লিউটিএর কাছে হস্তান্তরের জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হলে প্রভাবশালী কিংবা সরকারি সংস্থা, কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। তবে বিআইডব্লিউটিএ একা দখল উচ্ছেদের কার্যক্রম হাতে নিতে পারে না। জেলা প্রশাসন সহযোগিতা করলে বাঁকখালী নদী ও নদীবন্দরকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। 

বিআইডব্লিউটিএর সর্বশেষ প্রতিবেদনের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দখলদার প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির তালিকায় রয়েছে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদও। এর মধ্যে রয়েছে পৌর মেয়র ও কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমানের নাম। তিনি ছাড়াও বাঁকখালী দখলের তালিকায় রয়েছেন কক্সবাজার পৌর বিএনপির সভাপতি রফিকুল হুদা চৌধুরীও। মূলত নদী দখল করে সেই স্থানে ঘর বানিয়ে দোকান ও ভাড়া ঘর করেছেন তারা। এর মধ্যে মুজিবুর রহমান দখল করেছেন ১০ হাজার বর্গফুট এবং বিএনপির রফিকুল হুদা চৌধুরী দখল করেছেন ৪০ হাজার বর্গফুটের সমপরিমাণ নদী ও নদীতীরবর্তী জমি।

সরেজমিনে কক্সবাজারের প্রধান বাঁকখালী নদী ও নদীবন্দরকেন্দ্রিক এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, দখলের তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বরফকল, ফিশ প্রসেসিং প্রতিষ্ঠান, কোল্ড স্টোরেজ, এগ্রো প্রতিষ্ঠান। সবচেয়ে বেশি রয়েছে বরফকল ও সি-ফিশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। মূলত কক্সবাজারের সামুদ্রিক মত্স্য অবতরণ ও মাছ ধরার নৌযানের জন্য প্রয়োজনীয় বরফ তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে দখলদাররা ভাড়া প্রদান করেছে নদীর জমি। এছাড়া প্রভাবশালী দখলদাররা নদীর তীরে জমি দখল করে নদী ভরাট ছাড়াও ভবন নির্মাণ, মার্কেট তৈরির মাধ্যমে ভাড়া প্রদান করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর নুনিয়াছড়া এলাকায় নদীতীরবর্তী জমিতে একটি টাওয়ার, ভবন ও টিনশেডের ঘর তৈরি করেছে। পরিবেশ রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাটি সীমানাপ্রাচীর দিয়ে নদীতীরের দখলীয় জমি সংরক্ষিত করে রেখেছে।

এদিকে গত ২২ অক্টোবর বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের কাছে দেয়া ওই প্রতিবেদনে বিআইডব্লিউটিএ ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসন কর্তৃক যৌথভাবে প্রস্তুতকৃত ফোরশোর ম্যাপ অনুযায়ী জেলা প্রশাসন কর্তৃক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছে দেয়া সব ইজারা বাতিল এবং ভরাটকৃত মাটি-বালিসহ নির্মিত স্থাপনা অপসারণ করে নদীটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসনকে চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু এখনো জেলা প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এছাড়া যৌথ জরিপ ও তৈরীকৃত ফোরশোর ম্যাপ অনুযায়ী তীরভূমি দ্রুত হস্তান্তরে চিঠি দেয়া হলেও এখনো সেটি বুঝিয়ে দেয়নি কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।

বিআইডব্লিউটিএর নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার (কস্তুরীঘাট) নদীবন্দর ঘোষিত হলেও এখনো বিআইডব্লিউটিএর অনুকূলে তীরভূমি হস্তান্তর হয়নি। যার কারণে বিআইডব্লিউটিএ আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাসহ দ্য পোর্ট অ্যাক্ট ১৯০৮ ও দ্য পোর্ট রুলস ১৯৬৬ অনুযায়ী বন্দর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। তাছাড়া কক্সবাজার ভূমি প্রশাসন থেকে নদীর তীরভূমি ও ক্ষেত্রবিশেষে মূল নদী (রিভার বেড) ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বাঁকখালী নদী ও নদীবন্দরকে ঘিরে দ্বৈত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। যার কারণে দিন দিন দখলদারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় দখল-দূষণে নদীর বিভিন্ন অংশ ভরাট হয়ে নাব্য সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রভাবশালী মহলের কারণে বাঁকখালী নদীর উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। তাছাড়া জেলা প্রশাসন বিআইডব্লিউটিএকে নদীবন্দর ঘোষণার পরও নদীতীর বুঝিয়ে দিতে গড়িমসি করছে। ফলে প্রভাবশালী ছাড়াও পরিবেশ অধিদপ্তরের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানও নদী দখলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। কক্সবাজারের সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় বাঁকখালী নদী রক্ষা ও অবৈধ উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা জরুরি হয়ে পড়েছে। এতে বিআইডব্লিউটিএর ব্যর্থতার বিষয়টিও স্বীকার করেন তিনি।

জানা গেছে, ২০১৬ সালে এক আইনজীবীর মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ৬০ দিনের মধ্যে নদীর ফোরশোর বা নদীতীর বিআইডব্লিউটিএকে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। স্থানীয় জেলা প্রশাসন আদালতের নির্দেশনা দীর্ঘদিন ধরে না মানায় ঘোষণার এক যুগ পরও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি নদীবন্দর কর্তৃপক্ষ। যার কারণে কক্সবাজারের গুরুত্বপূর্ণ এ নদীটি ১৩১ জন তালিকাভুক্ত দখলদারের কারণে বন্দরের পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

বিআইডব্লিউটিএ বলছে, নদীবন্দরের কার্যক্রম আরো অধিক গতিশীল, আয়বর্ধক ও সুশৃঙ্খল করার জন্য কক্সবাজার নদীবন্দরের মডিউল প্রস্তুত করে অনুমোদনহীন বার্জ, জেটি, ডকইয়ার্ডসহ অন্য সব স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে নদীর পরিবেশ রক্ষা ছাড়াও সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু অবৈধ দখলদারসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অসহযোগিতার কারণে নদীবন্দর সীমানায় অবস্থিত খুরুশকুল ও চৌফলদণ্ডী পয়েন্টে অবৈধভাবে যাত্রী ও মালামাল পারাপার হচ্ছে। এতে বাঁকখালী নদীর দখলের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে।

বিআইডব্লিউটিএকে নদীবন্দরের জন্য তীরের ভূমি হস্তান্তর ও অবৈধ দখল উচ্ছেদের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আমিন আল পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাঁকখালী নদী দখলের বিষয়ে একটি তালিকা নদী কমিশন পাঠিয়েছে। জেলা প্রশাসন তালিকাটি হালনাগাদ করে নদীতীর বেদখলে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে।’ তবে বিআইডব্লিউটিএকে নদীর তীরভূমি বুঝিয়ে দেয়ার বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানা নেই বলে দাবি করেন তিনি।