২৯ মাসে প্রকল্পটি শেষ করার কথা থাকলেও চার দফা মেয়াদ বাড়িয়ে বাস্তবায়নকাল টেনে নেয়া হয়েছে ৯ বছর ৪ মাসে। এর মধ্যে ব্যয় ১৭৭ কোটি ৭৩ লাখ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৪ কোটি ৭৩ লাখ ১১ হাজার টাকায়। সর্বশেষ বর্ধিত মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হলেও নির্মিত ভবনগুলোয় এখনো উঠতে পারেননি পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। বিদ্যুৎ সংযোগ, লিফট চালু ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় যাদের জীবনমান উন্নয়নে প্রকল্পটি নেয়া হয়েছিল, তাদের বড় একটি অংশ এখনো নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করছেন।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের (জিওবি) অর্থায়নে প্রকল্পটি ২০১৭ সালের ২৮ মার্চ অনুমোদন পায়। মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) এর বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ২০১৭ থেকে জুন ২০১৯ পর্যন্ত এবং প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১৭৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য আবাসন ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো।

প্রকল্পের আওতায় ১৫ তলাবিশিষ্ট চারটি আবাসিক ভবন ও চারতলাবিশিষ্ট একটি বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

আবাসিক ভবনগুলোয় মোট ৭৮৪টি ফ্ল্যাট থাকবে। প্রতিটি ৫৬২ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে দুটি শোয়ার ঘর, একটি রান্নাঘর, একটি টয়লেট, একটি বাথরুম ও একটি বারান্দা রাখা হয়েছে। ভবনগুলোয় ১৪টি যাত্রীবাহী ও সাতটি সার্ভিস লিফট স্থাপনের পাশাপাশি আসবাব দিয়ে ফ্ল্যাটগুলো সাজিয়ে দেয়ার কথা রয়েছে। আবাসিক ভবনগুলোর জন্য পৃথক পয়োবর্জ্য শোধনাগার বা স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট ব্যবস্থাও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ডিএনসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অঞ্চল-৪-এর আওতাধীন গাবতলী এলাকায় মিরপুর বেড়িবাঁধের কাছে প্রায় চার একর জায়গায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। আবাসিক ও বিদ্যালয় ভবনের পাশাপাশি সীমানাপ্রাচীর, ভূমি উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ রাস্তা, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও সাব-স্টেশন নির্মাণও প্রকল্পের আওতায় রয়েছে।

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটির মেয়াদ চার দফা এবং ব্যয় তিন দফা বাড়ানো হয়েছে। ২০১৯ সালের জুনে অনুমোদিত প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় ১৭৭ কোটি ৭৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২২১ কোটি ৪৯ লাখ ৬৮ হাজার টাকা করা হয়। অর্থাৎ এক দফাতেই ব্যয় বাড়ে প্রায় ৪৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ জুন ২০২১ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ওই সময়েও কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২১ সালের ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেয়া হয়। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৪৯ কোটি ৮৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা এবং মেয়াদ বাড়ে জুন ২০২৩ পর্যন্ত। এরপর ২০২৩ সালের নভেম্বরে একনেক অনুমোদিত তৃতীয় সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে ২৮৪ কোটি ৭৩ লাখ ১১ হাজার টাকা এবং মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এতে মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ব্যয় বাড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ। তৃতীয় সংশোধনের পরও কাজ শেষ না হওয়ায় ব্যয় না বাড়িয়ে চতুর্থ দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এতে ফেব্রুয়ারি ২০১৭ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল দাঁড়ায় প্রায় ৯ বছর ৪ মাস। অর্থাৎ মূল পরিকল্পনার তুলনায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সময় লেগেছে তিন গুণেরও বেশি।

সরজমিনে দেখা যায়, আবাসিক ভবনগুলোর নির্মাণ ও রঙের কাজ শেষ হলেও এখনো বসবাসের উপযোগী হয়নি। লিফটের কমিশনিং চললেও কিছু সরঞ্জাম একটি ভবনের মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ভবনগুলোয় এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়নি। সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ শেষ হলেও অভ্যন্তরীণ সড়ক, পয়োনিষ্কাশন, ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর কাজ চলছে। বিদ্যালয় ভবনের মূল নির্মাণকাজ শেষ হলেও বৈদ্যুতিক কাজ এখনো বাকি। আবাসিক ভবনগুলোর নিচতলা টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ভবনের বাইরে শ্রমিকদের পাইপ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সংযোগ স্থাপনের কাজ করতে দেখা গেছে।

প্রকল্পটির প্রধান লক্ষ্য ছিল ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আবাসন সংকট নিরসন করা। তবে দীর্ঘ সময়েও প্রকল্পটি শেষ না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মীরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আবাসনের জন্য মিরপুর বেড়িবাঁধের কাছে চার একর জমি বরাদ্দ দিয়েছিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি)। সেখানে বসবাসকারী ৭২০টি পরিবারের মধ্যে ১৫০টির জন্য আধাপাকা ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়। বাকি ৫৭০টি পরিবার নিজ খরচে কাঁচা ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করে। এলাকাটিতে স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন, পর্যাপ্ত সড়ক, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, ড্রেনেজ, বিদ্যালয়সহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও প্রকল্পটির মূল সুবিধাভোগীরা এখনো প্রতীক্ষায় রয়েছেন নিজেদের জন্য নির্মিত আবাসনে ওঠার।

এ বিষয়ে প্রকল্পটির ষষ্ঠ পরিচালক ও ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি শতভাগ। ৭৮৪টি অ্যাপার্টমেন্টের এ প্রকল্পে ২০টি লিফট, দুটি সাবস্টেশন, জেনারেটরসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। আশা করছি, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রকল্পটি উদ্বোধন করা সম্ভব হবে। আমাদের এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ সংযোগ। আমরা ডিপিডিসির দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। তারা সর্বশেষ ফায়ার ফাইটিংয়ের একটি প্রত্যয়নপত্র চেয়েছে, যা আমরা দ্রুতই দেব।’

ব্যয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৭৭ কোটি থেকে বেড়ে ২৮৪ কোটি টাকা হলেও বর্তমান বাজারমূল্যে একই কাজ করতে অন্তত ৬০০-৭০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতো। সে হিসাবে তুলনামূলক সাশ্রয়ী ব্যয়ে উন্নত মানের এ আবাসন নির্মাণ করেছে ডিএনসিসি।