জাতিসংঘ ২০১৮ সালে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনটি সূচকে যে যোগ্যতা অর্জিত হয়েছে তা ছয় বছর ধরে রাখতে পারলেই ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। সরকারও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে বের করে নিয়ে আসতে চায়। তবে এক্ষেত্রে উত্তরণের পরও এলডিসি হিসেবে পাওয়া কিছু সুযোগ-সুবিধা যাতে আরো কিছুদিন অব্যাহত থাকে সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
কোনো দেশ উন্নয়নশীল স্বীকৃতি পাওয়ার পরও ট্রানজিশন পিরিয়ড হিসেবে তিন বছর ওই দেশকে এলডিসির সুযোগ-সুবিধা দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যরা। একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা ইইউর বাইরে থেকেও যেন পাওয়া যায়, সেজন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে লেখা অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে এ তথ্য মিলেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ফাতিমা ইয়াসমিনের লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়, গত এক দশকে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। সেই সুবাদে ২০১৮ সালে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভা থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্য বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়। সিপিডির সর্বশেষ তথ্যমতে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের বিভিন্ন সূচকে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, সব সূচকে উত্তীর্ণ হয়ে সিডিপির আগামী ২২ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা সভায় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করবে। সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর তিন বছর ট্রানজিশন পিরিয়ড অতিক্রমান্তে ২০২৪ সালে চূড়ান্তভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাবে বাংলাদেশ। উত্তরণের পর বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, যা বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। তবে উত্তরণের পর পরই যাতে স্বল্পোন্নত দেশের সব সুযোগ-সুবিধা একসঙ্গে প্রত্যাহার না হয় এবং কভিড-১৯ জনিত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে একটি যৌক্তিক সময় পর্যন্ত সব বাণিজ্য সুবিধা যেন অব্যাহত থাকে, সেজন্য প্রচেষ্টা চলছে। বাংলাদেশ উত্তরণের সুপারিশ গ্রহণ এবং ট্রানজিশন পিরিয়ড বাড়ানোর জন্য যুগপৎ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণ ও ট্রানজিশন পিরিয়ড বাড়ানোর নজির এর আগে নেই। তবে দুটোই একসঙ্গে হওয়া সম্ভব। কারণ গ্র্যাজুয়েশনটা করে জাতিসংঘ আর আমরা ট্রানজিশন চেয়েছি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায়। দুটি আলাদা সংস্থা। সুতরাং একই উত্তরণ এবং এলডিসির সুবিধা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।
তিনি আরো বলেন, আগে এলডিসি দেশগুলোর মধ্যে কোনো ঐক্য ছিল না। তবে এবার আমরা এলডিসি গ্রুপের ৩৬ দেশ এক হয়ে দাবি জানিয়েছি যে এলডিসি দেশই গ্র্যাজুয়েট করুক তাদের অতিরিক্ত ট্রানজিশন পিরিয়ড দিতে হবে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, এলডিসি গ্র্যাজুয়েট হয়ে গেলে শুধু ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে তিন বছর এলডিসির সুবিধা পাওয়া যায়। অন্যদিকে ডব্লিউটিওর মাধ্যমে শুধু এলডিসি দেশগুলো বিশ্ববাণিজ্যে ২৬ ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকে। এ ২৬ ধরনের সুবিধা যেন গ্র্যাজুয়েশনের পরও পৃথিবীর সব দেশে ১২ বছর পায় সে দাবি ডব্লিউটিওতে আমরা এরই মধ্যে জানিয়েছি।
ডব্লিউটিও এ আবেদন যদি গ্রহণ না করে, তাহলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সরকার তো চাচ্ছে যে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েশন হয়ে যাক। যদি তারা আমাদের আবেদন গ্রহণ না করে, তাহলে কিছু করার থাকবে না। তখন আমাদের নিজস্ব প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বাড়াতে হবে। এরই মধ্যে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের ব্যবসায়ীদেরও সতর্ক করা হচ্ছে। আমাদের ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির কাজটা আগামী চার বছর পর্যন্ত চলবে। আশা করা যায় আমরা চার বছরে সক্ষমতা অর্জন করতে পারব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা, কম সুদে বিদেশী ঋণ ও অনুদান পায়। ওষুধ উৎপাদনে মেধাস্বত্ব থেকেও অব্যাহতি পেয়ে আসছে। ওষুধের ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশগুলো এ সুবিধা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত পাবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসব সুবিধা আর থাকবে না। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশী পণ্যের ওপর গড়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ শুল্ক বাড়বে। ফলে বাংলাদেশকে বছরে ২৭০ কোটি ডলার রাজস্ব দিতে হতে পারে। এছাড়া রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ৪০০-৫০০ কোটি ডলারের আঘাত পড়তে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমরা গ্র্যাজুয়েশন করে ফেলব, সেটা ঠিক আছে। পাশাপাশি ট্রানজিশন পিরিয়ডটা যদি বাড়িয়ে নিতে পারে, তাহলে সেটা আরো ভালো। তবে এতে কিছু আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু সেটা অনেকটা ভিক্ষুকের ভিক্ষা চলে যাওয়ার মতো। তাই পেছন ফিরে না তাকিয়ে আমাদের আত্মমর্যাদা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই ভালো। আমরা যদি আমাদের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বাড়াতে পারি, তাহলে তেমন কোনো চিন্তার কারণ নেই।









