পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত এ আয়োজন এবার নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। পাঠক-দর্শনার্থী ছিল তুলনামূলক কম, বিক্রিও আশানুরূপ হয়নি। ফলে এবারের বইমেলা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন প্রকাশকরা।

গতকাল সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা নামে এবারের মেলার। মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সেলিম রেজা মূল মঞ্চে সমাপনী প্রতিবেদন পাঠ করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত ‘গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।

এবারের বইমেলার প্রতিপাদ্য ছিল ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেলার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত আট লেখকের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়। তবে মনোনীত হওয়া সত্ত্বেও কবিতায় মোহন রায়হানকে পুরস্কার দেয়া হয়নি।

নির্বাচন ও রমজানকে কেন্দ্র করে এ বছর মেলার সময়সূচি নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা ছিল। প্রথমে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৫ দিনের জন্য মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও প্রকাশকদের একটি বড় অংশ ঈদের পর মেলা আয়োজনের দাবি জানায়। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত মেলার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। ফলে সংক্ষিপ্ত সময়ের এ আয়োজন শেষ হয়েছে ১৮ দিনেই।

বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে এবারের মেলায় ৫৮৪টি প্রতিষ্ঠানকে ১ হাজার ৬৮টি ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়। আগের বছরের মতো কোনো প্যাভিলিয়ন রাখা হয়নি। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্টল ভাড়া মওকুফ করায় প্রকাশকদের কিছুটা স্বস্তি মিললেও বিক্রির পরিস্থিতি ছিল হতাশাজনক।

এবারের বইমেলার ব্যবসায়িক চিত্রকে ‘বিপর্যয়’ হিসেবে অভিহিত করেছে প্রকাশকদের সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’। শনিবার সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বিক্রি কমেছিল ৬০ শতাংশ, আর চলতি ২০২৬ সালে গত বছরের চেয়ে আরো ৮০ শতাংশ কমেছে। প্রকাশকদের মতে, এবারের পরিস্থিতি ২০২১ সালের করোনাকালীন মেলার চেয়েও ভয়াবহ। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচই ওঠেনি, যার মধ্যে ৩০ শতাংশ প্রকাশকের মোট বিক্রি ৫ হাজার টাকাও ছাড়ায়নি।

মেলা পরিচালনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২৬৯টি প্রতিষ্ঠানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ১৭ দিনে তাদের বিক্রির পরিমাণ ছিল ৮ কোটি টাকা। গড় হিসাবে ৫৭০টি প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি টাকায়। গত বছর প্রায় ৪০ কোটি টাকার বই বিক্রির তথ্য জানিয়েছিল মেলা কমিটি। ২০২৪ সালে মেলায় বই বিক্রি হয়েছিল ৬০ কোটি টাকার এবং ২০২৩ সালে বিক্রি হয়েছিল ৪৭ কোটি টাকার।

পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার এবার প্রকাশকদের স্টল ভাড়া মওকুফ করেছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির কারণ হয়েছে। এছাড়া এবার কোনো বড় প্যাভিলিয়ন রাখা হয়নি।

প্রকাশকদের সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’ জানায়, গত বছরের তুলনায় এবার বই বিক্রি কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ। তাদের মতে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিক্রি কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ এবং এবারের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ২০২১ সালের করোনাকালীন মেলার চেয়েও খারাপ। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচও ওঠেনি এবং প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকাশকের ৫ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি।

নতুন বই প্রকাশের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাংলা একাডেমির তথ্যমতে, গত বছর যেখানে ৩ হাজার ২৯৯টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছিল। এবারের মেলায় ১৪ মার্চ পর্যন্ত জমা পড়েছে ১ হাজার ৭৭১টি নতুন বই। যদিও প্রকাশিত সব বই সেখানে জমা না পড়ায় প্রকৃত সংখ্যা কিছুটা বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবার মোট ২৫২টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে।

প্রকাশক ও লেখকদের অনেকেই জানান, পাঠক উপস্থিতি আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। নির্বাচনী পরিবেশ, রমজান ও মেলার সময় কমে যাওয়াকে তারা এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। মেলার শেষ সময়ে সাধারণত কেনাবেচা বাড়লেও গত শুক্রবার সন্ধ্যায় আকস্মিক বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় মেলার পরিবেশও ব্যাহত হয়।

তবে প্রতিকূলতার মাঝেও আয়োজনের বিভিন্ন দিক ছিল প্রাণবন্ত। শিশুদের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চের সামনে বড় পরিসরে শিশু চত্বর সাজানো হয়। প্রতি শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত ছিল ‘শিশুপ্রহর’। পাপেট শো, বায়োস্কোপ এবং শিশু-কিশোরদের আবৃত্তি, সংগীত ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরেও ৯০টি স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘নানা বাস্তবতার কারণে এবার নতুন বই প্রকাশ কম হয়েছে। সামনে কয়েক বছর রমজান ফেব্রুয়ারিতে পড়বে, তাই ভবিষ্যতে রমজান ও বইমেলার সময়কে সমন্বয় করে নতুন পরিকল্পনা নেয়ার কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ।’

সমাপনী প্রতিবেদনে সেলিম রেজা বলেন, ‘বইমেলা নিছক বেচাকেনার নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চেতনার অংশ। সময়ের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বইমেলা আজ মানুষের প্রাণের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।’

সমাপনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ‘সংস্কৃতি একটি জাতির আত্মা। আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক সমাজ চাই, যেখানে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য থাকবে। এবারের প্রতিপাদ্য “‍বহুমাত্রিক বাংলাদেশ” সে বার্তাই দেয়।’" তিনি আরো জানান, সরকার প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে লাইব্রেরি ও শিল্পকলা একাডেমির বিস্তার ঘটাতে কাজ করবে, যাতে পরবর্তী প্রজন্মকে আবারো বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনা যায়।