চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশকে তিন কোটি ডোজ করোনার টিকা সরবরাহ করতে হবে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটকে। এতে ব্যর্থ হলে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে যে পরিমাণ ডোজ সরবরাহ করা বাকি থাকবে, বাংলাদেশকে তার মূল্য ফেরত দেবে প্রতিষ্ঠানটি। নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠুভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে দেয়া সিরাম ইনস্টিটিউটের ব্যাংক গ্যারান্টিতে এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মহামারীর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের কয়েকটি দেশে এরই মধ্যে করোনার টিকা প্রয়োগ শুরু হয়ে গিয়েছে। যদিও এদিক থেকে এখনো অনেকটাই পিছিয়ে বাংলাদেশ। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভরসা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত ও ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত ভ্যাকসিন। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে তিন কোটি ডোজ টিকা সরবরাহ করবে সিরাম ইনস্টিটিউট, যা একবারে দেশে আসবে না। কয়েকটি চালানে এ টিকা বাংলাদেশে পাঠাবে সিরাম ইনস্টিটিউট। এজন্য প্রতিষ্ঠানটি সময় পাচ্ছে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও বেক্সিমকো ফার্মা এবং সিরাম ইনস্টিটিউটের মধ্যকার ত্রিপক্ষীয় চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিনের মূল্য ও কোল্ড চেইনে পৌঁছানো পর্যন্ত মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ২৭১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা (প্রতি ডলারের বিনিময় হার ৮৪ টাকা ৭ পয়সা ধরে)। এর অর্ধেক এরই মধ্যে সিরাম ইনস্টিটিউটকে শর্তহীন ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে অগ্রিম প্রদান করা হয়েছে। বাকি অর্ধেক পরিশোধ করা হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ভ্যাকসিনটির অনুমোদন দেয়ার পর। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠুভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহের নিশ্চয়তা হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে সমপরিমাণ অর্থের একটি ব্যাংক গ্যারান্টি দিচ্ছে সিরাম ইনস্টিটিউট। এ গ্যারান্টিতে অর্থ বিভাগ এরই মধ্যে সম্মতিও দিয়েছে। গ্যারান্টিতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ব্যাংক গ্যারান্টির মেয়াদ বহাল থাকবে। ওইদিনের মধ্যে সিরাম ইনস্টিটিউট যদি ভ্যাকসিনের পুরোটা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে যে পরিমাণ ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারবে না; তার সমপরিমাণ অর্থ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ ব্যাংক গ্যারান্টি থেকে নগদায়ন করে নেবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, সিরাম থেকে যে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আনা হচ্ছে, তা একবারে আসবে না। প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে আসবে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে এ ভ্যাকসিন আসা শুরু হবে। সে অনুযায়ী তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আসতে সময় লাগবে আগস্ট পর্যন্ত। তার পরও কোনো কারণে যদি এটি মার্চ থেকে আসা শুরু হয়, তাহলে আরো এক মাস বেশি সময় লাগবে। তাই তাদের আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত শেষ সময় দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব টিকা প্রত্যেককে দুই ডোজ করে দিতে হবে। অর্থাৎ, দেড় কোটি মানুষকে তিন কোটি ডোজ টিকা দেয়া যাবে। এরপর আমরা কোভ্যাক্স থেকে প্রায় সাত কোটি ডোজ টিকা পাব, যা আরো সাড়ে তিন কোটি মানুষকে দেয়া যাবে। সব মিলিয়ে আমরা পাঁচ কোটি মানুষের জন্য ভ্যাকসিন পাব।
অক্সফোর্ড ছাড়াও অন্যান্য সংস্থার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন ক্রয় সম্পর্কে অগ্রগতি জানতে চাইলে সচিব বলেন, সম্ভব হলে আমরা ফাইজার ও মডার্নার টিকা কিনতাম। কিন্তু সেগুলো কিনে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। কারণ ফাইজারের টিকা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়, যা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সম্ভব নয়। তাই আপাতত অন্য কোথাও থেকে টিকা কেনা হচ্ছে না।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু সিরাম ইনস্টিটিউট বা কোভ্যাক্সের ওপর নির্ভরশীল না থেকে অন্যান্য উৎস থেকেও ভ্যাকসিন সংগ্রহে মনোযোগী হতে হবে সরকারকে। এ বিষয়ে করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, এখন ফাইজার বা বায়োএনটেকের করোনার টিকা আনারও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এসব টিকা সংরক্ষণের জন্য মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ডিপ ফ্রিজ লাগবে। এজন্য প্রত্যেক উপজেলায় এক বা দুটি করে মাইনাস ৭০ ডিগ্রির ডিপ ফ্রিজের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রায় ১৬ কোটি টাকা দিয়েই প্রতিটি উপজেলার জন্য দুটি এ ধরনের ফ্রিজের ব্যবস্থা করা যাবে।
এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক রোববার রাজধানীর মহাখালীতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই দেশে করোনার টিকা চলে আসবে। আগামী ছয় মাসে পর্যায়ক্রমে দেশে তিন কোটি টিকা আসবে। এ টিকা যাদের প্রয়োজন, তাদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে দেয়ার জন্য সরকার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।









