ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মেঘনা নদীর পাড়ে নির্মিত হচ্ছে খাদ্যশস্য সংরক্ষণাগার। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। এরই মধ্যে পার হয়েছে ছয় বছর। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ হয়নি আধুনিক এ সংরক্ষণাগারের কাজ। সর্বশেষ চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হলেও কাজ হয়েছে ৭০ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুষ্টিগুণ অটুট রেখে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত চাল সংরক্ষণ করা যাবে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যশস্য সংরক্ষণাগার।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রতি মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে বিপুল পরিমাণ ধান ও চাল সংগ্রহ করে খাদ্য বিভাগ। সংগৃহীত ধান-চাল রাখা হয় গুদামগুলোয়। তবে জেলার গুদামগুলোর ধারণক্ষমতা রয়েছে ২১ হাজার ৫০০ টন। আশুগঞ্জে আগে থেকে একটি সংরক্ষণাগার রয়েছে। তবে এটিতে গম সংরক্ষণ করা হয়। আর ধান ও চাল সংরক্ষণ করা হয় খাদ্যগুদামে। তবে প্রতি মৌসুমে যে পরিমাণ ধান ও চাল সংগ্রহ করা হয়, বিতরণের পর আরো উদ্বৃত্ত থাকে। জায়গা না থাকায় উদ্বৃত্ত চালগুলো সংরক্ষণে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার খাদ্যগুদামে।
চাল সংরক্ষণ নিয়ে সংকট নিরসনে আশুগঞ্জে নতুন একটি স্টিল রাইস সাইলো (খাদ্যশস্য সংরক্ষণাগার) নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে ২০১৮ সালের এপ্রিলে চুক্তি করে খাদ্য অধিদপ্তর। ১ লাখ ৫ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার সাইলোটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৫৪০ কোটি ৪৫ লাখ ৪৯ হাজার ২৬৪ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় দুই বছর। আধুনিক এ সাইলোটিতে ৩০টি বিন রাখা হয়েছে। একেকটি বিনে সংরক্ষণ করা যাবে ৩ হাজার ৫০০ টন চাল। স্টিল রাইস সাইলোটিতে স্বয়ংক্রিয় তাপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের মাধ্যমে আদ্রতা এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে দুই বছর পর্যন্ত চালের পুষ্টিগুণ অটুট রেখে সংরক্ষণ করা যাবে। সংরক্ষিত চাল প্যাকেটজাত এবং বস্তাবন্দি করতে ঘণ্টায় ৫০০ টন স্পিডের বেল্ট কনভেয়িং এবং চেইন কনভেয়িং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মূলত কভিড ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিসহ অভ্যন্তরীণ কিছু জটিলতায় প্রায় দেড় বছর সাইলোর নির্মাণকাজ বন্ধ থাকে। এছাড়া কভিডের কারণে বিদেশ থেকে প্রকল্পের পরামর্শকরাও যথাসময়ে আসতে পারেননি। এতে করে প্রকল্পের কাজ বিলম্বিত হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক দফায় বাড়ানো হয় প্রকল্পের মেয়াদ।
সরজমিনে নির্মাণাধীন স্টিল রইস সাইলোটি ঘুরে দেখা গেছে, ৩০টি বিনের সবকটির স্থাপন কাজ শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে নদী থেকে সাইলো পর্যন্ত জেটি, টপ সাইলো স্টিল ব্রিজ, টপ সাইলো স্টিল কলাম, বাল্ক ট্রাক রিসিভিং (বিটিআর) অবকাঠামো ও ট্রাক স্কেল ল্যাব ওয়েটসহ অন্যান্য অবশিষ্ট কাজগুলো চলছে। তবে কাজে খুব একটা গতি লক্ষ্য করা যায়নি। অনেকটা ঢিমেতালে চলছে কাজ। যদিও এরই মধ্যে বিদেশ থেকে সাইলোর সব যন্ত্রাংশ চলে এসেছে বলে জানিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা।
তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী মো. নিশাত হোসাইন বলেন, ‘সাইলোর বেশির ভাগ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আসে। কিন্তু কভিডের কোনো যন্ত্রাংশ আমদানি করা যায়নি। এজন্য দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়া নতুন করে সংকটে ফেলে। এতে করে কাজের অগ্রগতি কম হয়েছে। তবে সব সংকট কাটিয়ে এখন পুরোদমে কাজ চলছে। আশা করছি সরকারের বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যাবে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আলমগীর কবির বলেন, ‘প্রতি মৌসুমেই বিতরণের পর আমাদের বিপুল পরিমাণ চাল উদ্বৃত্ত থাকে। গুদামগুলোয় জায়গা সংকটের কারণে সেগুলো আশপাশের জেলায় পাঠানো হয়। নতুন সাইলোটির নির্মাণকাজ শেষ হলে আমাদের এ সমস্যা আর থাকবে না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক মো. রেজাউল করিম শেখ বলেন, ‘কভিডের কারণে প্রকল্পটি বিলম্বিত হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য কিছু সমস্যার কারণে এক থেকে দেড় বছর কোনো কাজই করা যায়নি। ফলে চার দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও ব্যয় বাড়বে না। সম্প্রতি সব সমস্যা সমাধান করে কাজ শুরু হয়েছে। আশা করি ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।’









