এ ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাটি তদন্ত পর্যায়েই রয়েছে প্রায় ১৪ বছর ধরে। কোনো কূলকিনারাই করতে পারেননি তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

কেবল এ ঘটনাই নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের হত্যা মামলাগুলোর তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গড়ে একটি মামলার তদন্ত সম্পন্ন হতেই সময় লাগছে প্রায় ১০ বছর ১১ মাস। কিছু ক্ষেত্রে এ সময়সীমা ৩০ বছরও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, তদন্তে এ অস্বাভাবিক বিলম্বের কারণে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষীদের বয়ানেও আসে পরিবর্তন। পাশাপাশি তদন্তের দুর্বলতাও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। ফলে থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোর প্রায় ৫২ শতাংশই প্রমাণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে পুলিশ, যার সুযোগ নিয়ে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব অসংগতি। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে কমে আসবে তদন্তের সময়। সেই সঙ্গে বাড়বে তদন্তসংশ্লিষ্টদের দক্ষতাও।

‘মামলায় সাজার হার কম হওয়ার কারণ অনুসন্ধান প্রতিবেদন’ শীর্ষক পিবিআইয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মামলার তদন্ত সম্পন্ন করতে যতটুকু সময় ব্যয় হয়, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি সময় লাগে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুনের ঘটনার ৩০ বছর পর আদালতের রায় আসছে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে উঠে আসা এ চিত্র মূলত দেশের বিচার ব্যবস্থার একটি কাঠামোগত দুর্বলতাকেই নির্দেশ করছে। খুনের মতো অপরাধে যদি সাজার হার না বাড়ে, তবে সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। তদন্তে স্বচ্ছতা ও বিচারে দ্রুততা—এ দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।

দ্রুত সময়ের মধ্যে পুলিশকেই নির্ভুল তদন্তের উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘যেকোনো মামলা বা হত্যা মামলার ক্ষেত্রে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত করে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা পুলিশের দায়িত্ব। আমরা দেখেছি এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল ঘুরতে থাকে, কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয় না। তদন্তের নামে মূলত সময়ক্ষেপণ বা কাউকে প্রক্রিয়াগতভাবে সুযোগ করে দেয়া হয় এর মাধ্যমে। এটা আইনগতভাবে অপরাধ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে বিচারকে বিলম্বিত করা। দিনের পর দিন যখন এ ধরনের কার্যক্রম চলে তখন কিন্তু সাধারণ মানুষের মাঝেও আইনের প্রতি একধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়।’

দীর্ঘ সময় ধরে হত্যা মামলার তদন্ত চলতে থাকলে অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায় বলে উল্লেখ করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তার মতে, আলামত নষ্ট হয়ে গেলে মামলার নির্ভরযোগ্য তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যায় এবং এ সুযোগে অনেক অপরাধী শাস্তি এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।

পুলিশের বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা পিবিআইয়ের গবেষণায়ও দেখা গেছে, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে নিষ্পত্তি হওয়া ২৩৮টি হত্যা মামলার মধ্যে প্রায় ৫১ দশমিক ৭ শতাংশের ক্ষেত্রেই আসামিরা খালাস পেয়ে গেছে। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি মামলায় অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। এর বিপরীতে সাজার হার ছিল মাত্র ৪৮ দশমিক ৩ শতাংশ। মূলত বিচারের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সাক্ষী এবং বাদীরা অনেক সময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, যা সরাসরি মামলার রায়কে প্রভাবিত করে। আবার দীর্ঘ সময় আগে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী খুঁজে পাওয়া বা তাদের স্মৃতিতে থাকা ঘটনার বর্ণনা অক্ষুণ্ণ রাখাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে আবার জীবনের নিরাপত্তার অভাব বা সামাজিক চাপে সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত থাকেন।

হত্যা মামলার নির্ভুল তদন্তের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করতে হয় বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘হত্যা মামলা দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলা। এ ধরনের মামলা নির্ভুল তদন্তে বেশকিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয়। যেমন ফরেনসিক, ব্যালিস্টিক পরীক্ষাসহ নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি সাক্ষীদের যথাসময়ে আদালতে হাজির করে বয়ান রেকর্ডের বিষয় থাকে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই প্রতিটি হত্যা মামলার তদন্ত সম্পন্ন করা হয়।’

পুলিশের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করেন, প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তদন্তে অতিরিক্ত সময় লেগে যায়। এ সময় কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলেও তিনি জানান।