নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় ঝালকাঠিতে প্রসার ঘটেছিল লবণ শিল্পের। কালের বিবর্তনে এখনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এ জেলার লবণ শিল্প। সনাতন পদ্ধতিতে তৈরি এ লবণ যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। লবণ শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, ব্যাংকঋণের অপ্রতুলতা ও গ্যাস সংযোগ না থাকায় জেলার লবণ পরিশোধন কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন হচ্ছে না। ফলে করপোরেট নিয়ন্ত্রণাধীন লবণ কারখানাগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছেন তারা।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, আধুনিক ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন করতে হলে গ্যাসের প্রয়োজন হবে। ঝালকাঠিতে গ্যাসলাইন না থাকায় এ পদ্ধতিতে লবণ কারখানা চালু করা যাচ্ছে না। তবে এরই মধ্যে গ্যাস ছাড়াই সেমি ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন শুরু করেছে ঝালকাঠির মিলগুলো। পদ্মা সেতু হওয়ায় এখন স্বপ্ন দেখছেন লবণ মিল মালিকরা। স্বপ্ন দেখছেন গ্যাস সংযোগেরও। শুধু তাই নয়, এখানকার লবণ বিভিন্ন জেলায় বিপণনের ক্ষেত্রেও পদ্মা সেতুতে আসবে ব্যাপক পরিবর্তন।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, স্বাধীনতার পরপরই মূলত ঝালকাঠির লবণ শিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে। বঙ্গোপসাগরের লোনাপানি থেকে উৎপাদিত অপরিশোধিত লবণ চট্টগ্রামের সাম্পানের মাঝিরা ঝালকাঠি নিয়ে আসতেন। অপরিশোধিতি এ লবণ পরিশোধিত করে উপকূলসহ দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জেলার চাহিদা মেটানো হতো।
তখন কারখানাগুলোয় জাঁতা প্রক্রিয়ায় লবণ তৈরি হতো। ঝালকাঠি শহরের বাসন্ডা নদীর দুই তীরে পর্যায়ক্রমে গড়ে ১৪টি লবণ কারখানা। এরপর দেশে আধুনিক ভ্যাকুয়াম লবণ মিল চালু হলে তার প্রভাব পড়বে ঝালকাঠিতে। কমে আসে লবণ মিলের সংখ্যা। এর পরও পাঁচটি জেলা নিয়ে গঠিত ঝালকাঠি লবণ জোনের ১৩টি মিলের আটটিই ঝালকাঠিতে। এ আটটির মধ্যে সেমি ভ্যাকুয়াম তিনটি ও পাঁচটিতে সনাতন পদ্ধতিতে উৎপাদন চলছে।
লবণ মিল মালিকরা জানান, ঝালকাঠিতে গ্যাসের লাইন না থাকায় তারা ভ্যাকুয়াম পদ্ধতির বা লবণ মিলের আধুনিকায়ন করতে পারছেন না। অন্যদিকে লবণ খাতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ না থাকায় লবণ মিলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া প্রণোদনা না পাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তাদের।
লবণ মিল মালিক সমিতি কর্তৃপক্ষ জানায়, বিসিক থেকে করোনাকালীন ঝালকাঠি লবণ মিলগুলোয় ৬০ লাখ টাকা প্রণোদনা দেয়ার জন্য বরাদ্দ থাকলেও তারা পেয়েছেন ১৫ লাখ টাকা। তবে বিসিক কর্তৃপক্ষ বলেছে, ৬০ লাখ টাকা শুধু লবণ মিলের জন্য নয়, ঝালকাঠির পুরো কুটির শিল্পেই বরাদ্দ হয়েছিল। ঝালকাঠির মিলগুলোয় দুই ধরনের লবণ উৎপাদিত হয়। একটি হচ্ছে ভোজ্য লবণ (প্যাকেটজাত) ও অন্যটি ইন্ডাস্ট্রি সল্ট (পশুখাদ্য)। মাসে ৩ হাজার ৫০০ টন ভোজ্য লবণ ও ৭ হাজার টন ইন্ডাস্ট্রি লবণ উৎপাদিত হয় এ জেলায়। প্রায় ৪০০ শ্রমিক ঝালকাঠি লবণ মিলগুলোয় বর্তমানে কর্মরত।
ঝালকাঠি শহরের পশ্চিম প্রান্তে বাসন্ডা নদীর দুই তীরে অবস্থিত লবণ মিলগুলোয় গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা ট্রলারযোগে লবণ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার বড় জাহাজে বিদেশ থেকে আনা কেমিক্যাল ও কাঁচামাল কারখানায় খালাস করা হচ্ছে। এখান থেকে লবণ যাচ্ছে পদ্মার এপারের প্রায় সব জেলায়। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ঢাকায়ও ঝালকাঠির লবণের বাজার সৃষ্টি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে লবণ মিল শ্রমিকরা জানান, তারা ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না। বর্তমান দামের ঊর্ধ্বগতিতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অন্যদিকে লবণ মিল মালিকরা বলছেন তারা ব্যাংক ঋণ না পাওয়া এবং ঝালকাঠিতে গ্যাসলাইন না থাকার কারণে লবণ মিলগুলোর আধুনিকায়ন সম্ভব হচ্ছে না। যার কারণে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানো যাচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে ঝালকাঠি লবণ মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জামাল শরিফ বলেন, ‘গ্যাস লাইন না থাকায় আধুনিক মিলগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে তাদের কষ্ট হচ্ছে। এছাড়া লবণ শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত ঋণও নেই। তবে গ্যাসলাইন, ব্যাংকঋণ ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঝালকাঠির লবণ শিল্প আবারো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।’
এ বিষয় জানতে চাইলে ঝালকাঠি বিসিকের উপব্যবস্থাপক মো. সাফাউল করিম বলেন, ‘লবণ শিল্প প্রসারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া হবে। এছাড়া পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ঢাকায়ও ঝালকাঠির লবণের বাজার তৈরির সম্ভবনা দেখা দিয়েছে।’










