পাহাড়, নদী ও সমুদ্রের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম একসময় পরিচিত ছিল স্বাস্থ্যকর নগরী হিসেবে। কিন্তু হালের অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও দূষণ জনস্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ডায়রিয়ার মতো অসুখের প্রকোপ বেড়েছে। ২০২২ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত) চট্টগ্রামে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৪৬২। অথচ চলতি বছর প্রথম পাঁচ মাসে চট্টগ্রাম জেলায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ২৩ হাজার ১৫১ জন! অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছর একই সময় চট্টগ্রামে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ১১ হাজার ৬৮৯ জন।
তীব্র তাপদাহ, জলাবদ্ধতা, নগরীর অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবেশগত সুরক্ষার অভাব ও সুপেয় পানি সরবরাহ সংকটে চট্টগ্রামে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগের তীর যাচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসার দিকে। চট্টগ্রাম শহরে সুপেয় পানি সরবরাহের প্রধান সংস্থা চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সরবরাহ নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা পানিতে গন্ধ, ময়লাযুক্ত পানি সরবরাহ, ভূ-গর্ভস্থ পানির পাইপলাইন ফেটে গিয়ে মাটি ও ড্রেনের দূষিত পানি যুক্ত পানি সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।
নতুন পাইপলাইন বসানো হলেও সরবরাহ করা পানির চাপ বেশি থাকায় প্রতিদিনই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পানির পাইপে ছিদ্র হওয়ার ঘটনাও অনেক। এ কারণে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা পানিতে মাটি ও ড্রেনেজ সিস্টেমের ময়লাযুক্ত পানি মিশ্রণের অভিযোগ আছে ওয়াসার বিরুদ্ধে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে লবণাক্ত পানি সরবরাহ। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসার কারণে সমুদ্রের নোনা পানি কর্ণফুলী নদীর উজানে প্রবেশ করায় ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। চলতি বছরের শুরু থেকে সর্বশেষ জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ওয়াসার সরবরাহ করা পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল অত্যধিক। ফলে লবণাক্ত পানি পান করায় নগরীতে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগের ১৪টি জেলা চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আটজন। এর মধ্যে সাতজন রোগীই চট্টগ্রাম জেলার, অন্য রোগী কুমিল্লা জেলার। ২০২২ সালে ১৪ জেলার মধ্যে সর্বমোট ২৩ জন রোগী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেও চট্টগ্রাম জেলায় একজনও মারা যায়নি। ২০২২ সালে ডায়রিয়ায় সর্বোচ্চ ১১ জন মারা গিয়েছিল বান্দরবান জেলায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক সময়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী বাড়ার আরেকটি কারণ নাজুক ড্রেনেজ সিস্টেম ও জলাবদ্ধতা। চট্টগ্রাম নগরীর ড্রেনেজ সিস্টেম উন্নয়নে একটি মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করলেও এখনো শেষ হয়নি। চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া, গুরুত্বপূর্ণ ড্রেনগুলো দখল ও সরু হয়ে যাওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকার ঘটনা ঘটছে।
তাছাড়া ড্রেনেজ সিস্টেম অকার্যকর থাকায় প্রতিদিন দুটি জোয়ারের সময় নগরীর অনেক এলাকা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়। জোয়ারের কারণে ড্রেনের দূষিত পানি সড়ক ও সাধারণ মানুষের বাসস্থানে পৌঁছলে ডায়রিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। ড্রেনেজ সিস্টেম উন্নত করার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন ও ড্রেনের পানি মানুষের নাগালের মধ্যে প্রবেশ করা প্রতিরোধ করতে না পারলে ডায়রিয়ার প্রকোপ কমবে না বলেই মনে করছেন তারা।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজল হক শাহ্ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডায়রিয়া একটি পানিবাহিত রোগ। দূষিত পানি ব্যবহার বা পান করার কারণে ডায়রিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাছাড়া এ বছর তীব্র তাপদাহের কারণে মানুষ যত্রতত্র খাবার গ্রহণ, দূষিত পানি ব্যবহার করায় ডায়রিয়ায় আক্রান্তের হার বেশি। ওয়াসার পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণেও ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়তে পারে।’
এদিকে চট্টগ্রামের অন্য একটি মেগা প্রকল্প এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় প্রধান সড়কটির দুই পাশের ফুটপাত, ড্রেনসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর কারণে যান চলাচলসহ মানুষের চলাচলের নানামুখী প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। ফুটপাত না থাকায় ড্রেনে মানুষ পড়ে মৃত্যুর একাধিক ঘটনাও ঘটেছে চট্টগ্রামে। নির্মাণ কাজ চলাকালীন সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশগত দিক অমান্য করা, অবকাঠামো নির্মাণ কাজ চলাকালীন পার্শ্ববর্তী সড়ক মেরামত না করে দীর্ঘদিন ফেলে রাখা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ ফেলে চলে যাওয়ার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দীর্ঘদিন সংস্কারহীন থাকায় পানি, বায়ু ও শব্দ দূষণের মাত্রা চট্টগ্রামে অনেক বেড়েছে। ফলে চলতি গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে চট্টগ্রামে ডায়রিয়ার প্রকোপ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. হামিদ উল্লাহ মেহেদী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে এ বছর ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। ওয়াসার পানির কারণে চট্টগ্রামে ডায়রিয়ায় আক্রান্তের হার বেড়েছে কিনা সে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। বছরের প্রথম কয়েক মাস উষ্ণতম হলেও এ বছর অত্যধিক তাপমাত্রা ছিল চট্টগ্রামে। গরমের সময়ে মানুষ পানি কিংবা খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে অসচেতন থাকলে ডায়রিয়া, কলেরায় আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ে। এক্ষেত্রে ড্রেনেজ সিস্টেমের সমস্যাজনিত কারণে বস্তি কিংবা সাধারণ মানুষের মধ্যে ডায়রিয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।’










