রক্তের প্রয়োজন কখনো সময় মেনে আসে না। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত, জটিল অস্ত্রোপচারের রোগী, প্রসবজনিত রক্তক্ষরণে সংকটাপন্ন মা কিংবা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুর জীবন বাঁচাতে মুহূর্তের মধ্যে প্রয়োজন হতে পারে কয়েক ব্যাগ রক্ত। হাসপাতালের শয্যার পাশে তখন স্বজনদের ছোটাছুটি, পরিচিতজনকে ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, রক্তদাতা খোঁজার ব্যস্ততা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজপড়ুয়া তরুণদের বড় একটি অংশের শরীরে রয়েছে অন্যের জীবন বাঁচানোর সক্ষমতা। সচেতনতা ও আগ্রহও একেবারে কম নয়। তবুও নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদাতার তালিকায় তাদের অনেকেই যুক্ত হচ্ছেন না। স্বেচ্ছায় ও নিয়মিত রক্তদাতার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি না হওয়ায় সংকটের সময় কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয় রোগীর স্বজনদের। কখনো কখনো রক্তের অভাবে অনেকের প্রাণটাও চলে যায় অকালে।
তরুণদের মধ্যে রক্তদানের বিষয়ে আগ্রহ ও ইতিবাচক মনোভাব একেবারে যে কম, তা কিন্তু নয়। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ কিংবা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে রক্তদানে উৎসাহিত হওয়ার নজিরও রয়েছে। তবে আগ্রহ থেকে বাস্তবে রক্তদানে পৌঁছানোর পথটি এখনো বেশ দীর্ঘ। সচেতনতার ঘাটতি, সূচভীতি, রক্তদানের পর শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে শঙ্কা এবং সময়ের অভাবের মতো প্রতিবন্ধকতা অনেক তরুণকে রক্তদান থেকে দূরে রাখছে। অর্থাৎ রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানা এবং নিজে রক্ত দিতে এগিয়ে আসার মধ্যে তৈরি হয়েছে একটি বড় ব্যবধান।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণায় এ ব্যবধানের চিত্র উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী বিএমজে ওপেনে প্রকাশিত ‘ব্লাড ডোনেশন নলেজ, অ্যাটিচিউডস, প্রিভিয়াস ডোনেশন অ্যান্ড স্টুডেন্ট কমিউনিটি এনগেজমেন্ট অ্যাট রাজশাহী ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ: আ ক্রস-সেকশনাল স্টাডি’ শীর্ষক গবেষণাটিতে ৫০০ শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের ৫৪ শতাংশের রক্তদান বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে। ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে ৪৬ শতাংশের। কিন্তু জীবনে অন্তত একবার রক্ত দিয়েছেন এমন শিক্ষার্থীর হার কেবল ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ পর্যাপ্ত জ্ঞান ও ইতিবাচক মনোভাব থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো রক্তদানের অভিজ্ঞতার বাইরে রয়েছেন। এ ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা জানা এবং আগ্রহী হওয়ার পরও কেন তরুণদের বড় একটি অংশ স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে এগিয়ে আসছেন না?
শিক্ষার্থীদের মধ্যে রক্তদানের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে সূচভীতির বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে। ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, সুচের ভয় তাদের রক্তদানে নিরুৎসাহিত করে। ৩১ শতাংশের ক্ষেত্রে সময়ের অভাব একটি বড় বাধা। রক্তদানের পর শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে, এমন উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন ২৮ শতাংশ। এছাড়া ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী রক্তদান নিয়ে বিভিন্ন ভুল ধারণা বা প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে মনে করেছেন।
এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রক্তদান সম্পর্কে ভুল ধারণা। অনেকের মধ্যে এখনো বিশ্বাস রয়েছে, রক্ত দিলে শরীরের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে কিংবা দীর্ঘদিন দুর্বলতা থেকে যেতে পারেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, একবার রক্ত দিলে ঘন ঘন রক্ত দেয়ার প্রয়োজন তৈরি হয়। এসব ধারণার কারণে সুস্থ ও উপযুক্ত ব্যক্তিরাও রক্তদানে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন।
অথচ রক্তদানের আগে উপযুক্ততা যাচাই, নিরাপদ পদ্ধতিতে রক্ত সংগ্রহ এবং পরবর্তী পরিচর্যার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত ভয় ও ভুল ধারণা দূর করতে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম।
গবেষণায় অবশ্য রক্তদানের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার ইতিবাচক ভূমিকারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেখা যায়, রক্তদানবিষয়ক প্রচারণার সংস্পর্শে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় ১ দশমিক ৭ গুণ বেশি। তাদের ইতিবাচক মনোভাবের সম্ভাবনা ১ দশমিক ৪ গুণ এবং পূর্বে রক্তদানের সম্ভাবনা ১ দশমিক ৯২ গুণ বেশি।
একইভাবে বন্ধু ও সহপাঠীদের উৎসাহ রক্তদানের প্রতি মনোভাব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যেসব শিক্ষার্থী সহপাঠীদের কাছ থেকে রক্তদানের বিষয়ে উৎসাহ পেয়েছেন, তাদের ইতিবাচক মনোভাবের সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় ২ দশমিক ১ গুণ বেশি। পূর্বে রক্তদানের ক্ষেত্রেও এ শিক্ষার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চিত্র পাওয়া গেছে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে। রক্তদান বা অন্যান্য শিক্ষার্থী সংগঠনের সদস্যদের পূর্বে রক্তদানের সম্ভাবনা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন এমন শিক্ষার্থীদের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৫ গুণ বেশি। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৫ শতাংশ সন্ধানী, ১০ শতাংশ বাঁধন ও ৫ শতাংশ অন্যান্য শিক্ষার্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
এ পরিসংখ্যান বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে সন্ধানী, বাঁধনসহ নানা সংগঠন রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, রক্তদাতা সংগ্রহ, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং জরুরি রোগীদের জন্য রক্তদাতার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের কাজ করছে। এসব সংগঠনের কার্যক্রম শুধু রক্তদাতা সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক সম্পৃক্ততা তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে।
গবেষণায় রক্তদানের ক্ষেত্রে তরুণ ও তরুণীদের মধ্যে ব্যবধানও স্পষ্ট হয়েছে। তরুণদের মধ্যে আগে রক্ত দিয়েছেন এমন শিক্ষার্থীর হার ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ। তরুণীদের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যান্য বিষয় সমন্বয়ের পরও তরুণীদের রক্তদানের সম্ভাবনা তরুণীদের তুলনায় কম পাওয়া গেছে।
গবেষণায় পূর্বে রক্ত দিয়েছেন এমন ১৯০ শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ সর্বশেষ রক্ত দিয়েছেন ক্যাম্পাস বা ভ্রাম্যমাণ রক্তদান কর্মসূচিতে। ৩০ শতাংশ রক্ত দিয়েছেন ব্লাড ব্যাংকে এবং ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ হাসপাতালে। রক্তদানের কারণ হিসেবে ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ জানিয়েছেন স্বেচ্ছায় রক্ত দেয়ার কথা। ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ দিয়েছেন পরিবারের সদস্য বা পরিচিত কারো প্রয়োজনে। জরুরি অনুরোধে রক্ত দিয়েছেন ২১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শিক্ষার্থী সংগঠনের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রক্ত দিয়েছেন ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
এ পরিসংখ্যানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রক্ত দিলেও উল্লেখযোগ্য অংশের রক্তদানের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে কোনো না কোনো জরুরি প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার জায়গা এখনো রয়েছে।
বাংলাদেশে রক্তের চাহিদার বড় অংশ এখনো পূরণ হয় রোগীর স্বজন, পরিচিতজন কিংবা প্রতিস্থাপনমূলক দাতার মাধ্যমে। গবেষণায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, দেশে বছরে আনুমানিক ৮ লাখ থেকে ১০ লাখ ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে স্বেচ্ছায়, বিনা পারিশ্রমিকে রক্তদাতাদের কাছ থেকে আসে প্রায় ৩০ শতাংশ। বাকি অংশের বড় ভাগ আসে পরিবারের সদস্য বা রোগীর প্রয়োজনে সংগৃহীত রক্ত থেকে।
স্বেচ্ছায় রক্তদানের ঘাটতি শুধু রক্ত সংগ্রহের পরিমাণের প্রশ্ন নয়; এটি জরুরি সময়ে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য রক্তের প্রাপ্যতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বেচ্ছায় ও বিনা পারিশ্রমিকে রক্তদানকে নিরাপদ এবং টেকসই রক্ত সরবরাহের সবচেয়ে উপযোগী উৎস হিসেবে বিবেচনা করে। এ ব্যবস্থায় রক্তদাতা কোনো আর্থিক বা পারিবারিক চাপের কারণে নয়, বরং অন্যের জীবন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় রক্ত দেন।
দেশে প্রতি বছর ২ নভেম্বর ‘জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান দিবস’ পালন করা হয়। বিনামূল্যে রক্তদানে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ এবং নিরাপদ রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।
এক ব্যাগ রক্তের জন্য যখন কোনো হাসপাতালে একজন রোগীর স্বজনকে পরিচিত মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তখন বোঝা যায় স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংস্কৃতি কতটা জরুরি। তরুণদের মধ্যে সেই সম্ভাবনা রয়েছে। এখন প্রয়োজন সম্ভাবনাকে অভ্যাসে পরিণত করা, যাতে রক্তের প্রয়োজন দেখা দেয়ার পর দাতা খোঁজার তাড়াহুড়ো নয়, বরং স্বেচ্ছায় রক্তদানের প্রস্তুতিই হয়ে ওঠে সমাজের স্বাভাবিক চর্চা।










