মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম আদি মহাকাব্য ‘রামায়ণ’। রাজপুত্র রামের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এ মহাকাব্যে। তিনি বিষ্ণুর সপ্তম অবতার। মর্ত্যে এসে তাকে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেসব নিয়েই এ আখ্যান। পরিচিত এ গল্প অসংখ্যবার অসংখ্যবার নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। তবে এর আগে ‘রামায়ণ: রাইজ অব আ লেজেন্ড’-এর মতো বিশাল আয়োজনে পুনর্নির্মাণ হয়নি।
পরিচালক নীতেশ তিওয়ারি ও ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রথম সারির কয়েকজন ব্যক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবারের ‘রামায়ণ’। রয়েছেন হলিউডের খ্যাতিমান সংগীত পরিচালক হান্স জিমার, যিনি চলচ্চিত্রটিকে জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে ছিলেন যত্নশীল। সব মিলিয়ে একটি মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র হিসেবে দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করে ‘রামায়ণ’।
এ চলচ্চিত্রে রয়েছে প্রেম, অ্যাকশন ও সংগীতের সম্মিলন। পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের সংঘাত নিয়ে এমন একটি গল্পও রয়েছে, যা নীরবে দর্শকের প্রত্যাশা নিয়ে খেলা করে। তবে গল্প বলার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা রয়েছে। সিনেমাটির সামগ্রিক উপস্থাপনায় এর প্রভাব পড়েছে। তা সত্ত্বেও নির্মাণশৈলী এবং উপভোগ্য কিছু মুহূর্তের কারণে বড় পর্দায় দেখার মতো সিনেমা এটি।

রাবণ চরিত্রে যশ
চোখধাঁধানো স্পেশাল ইফেক্টস ও চমৎকার স্টান্টের সমন্বয়ে ‘রামায়ণ: রাইজ অব আ লেজেন্ড’ দর্শককে পুরো সময় আকৃষ্ট রাখে। হলিউড ও ভারতীয় হিন্দি ব্লকবাস্টার সিনেমার জাঁকজমক কীভাবে কাজে লাগাতে হয়, তার চমৎকার উদাহরণ এটি। মহাকাব্যের পৌরাণিক আবহকে পর্দায় তুলে ধরতে নির্মাণের বিশাল ব্যাপ্তি পুরোপুরি কাজে লেগেছে। শুধু দৃশ্যায়ন ও কারিগরি নির্মাণের বিবেচনায় ‘রামায়ণ: রাইজ অব আ লেজেন্ড’ ভারতীয় চলচ্চিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
হান্স জিমার ও এ আর রহমানের সংগীতায়োজন মহাকাব্যিক আবহ তৈরি করেছে। চিত্রগ্রাহক মহেশ লিমায়ে ও পঙ্কজ কুমার পরিচালক তিওয়ারির সঙ্গে মিলে পর্দায় এ জগৎকে তুলে ধরেছেন উজ্জ্বল ও বর্ণিলভাবে। সিনেমাটিতে পৌরাণিক উপাদানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জাদু, দানব ও দেবতাদের আবির্ভাবে বদলে যায় চারপাশের জগৎ। এসব দৃশ্যের মধ্যে স্বাভাবিক বাস্তবতার অনুভূতি ধরে রাখার কঠিন, কিন্তু সেই কাজও অনেক ক্ষেত্রে সফলভাবে করেছেন নির্মাতারা।
সিনেমার বিশাল ব্যাপ্তির মধ্যেও কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর ওপর থেকে মনোযোগ সরে যায়নি। অ্যাকশন ও কোরিওগ্রাফির প্রতি বিশেষ মনোযোগ অভিনয়শিল্পীদের নিজেদের দক্ষতা দেখানোর যথেষ্ট সুযোগ করে দিয়েছে। প্রায় প্রতিটি দৃশ্যেই নির্মাণের কারিগরি দক্ষতার ছাপ রয়েছে। লড়াইয়ের দৃশ্যগুলো দারুণভাবে সাজানো হয়েছে, সেগুলোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও আছে। অন্যদিকে সংগীতের ব্যবহারও সংশ্লিষ্ট দৃশ্যের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। দৃশ্যায়ন ও কারিগরি নির্মাণের দিক থেকে ‘রামায়ণ: রাইজ অব আ লেজেন্ড’ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
তবে দৃশ্যনির্ভর নির্মাণের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তিওয়ারি ও শ্রীধর রাঘবনের লেখা চিত্রনাট্য মূল মহাকাব্যের কাহিনী বিশ্বস্ততার সঙ্গে সংক্ষেপে তুলে ধরেছে। পাশাপাশি সিনেমার উপযোগী কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও যুক্ত হয়েছে। কিন্তু রাম (রণবীর কাপুর) ও সীতা (সাই পল্লবী) চরিত্রের উপস্থাপনায় একধরনের সরলতা রয়েছে, যা অনেক সময় তাদের একমাত্রিক করে তোলে।
অ্যাকশন দৃশ্যগুলোয় রণবীর ও পল্লবী দুজনই ভালো করেছেন। চরিত্রের বিস্তার ঘটেছে এমন কয়েকটি দৃশ্যেও তাদের অভিনয় ছিল দুর্দান্ত। কিন্তু দুই প্রধান চরিত্র এবং সিনেমার বেশির ভাগ চরিত্রই পৌরাণিক পরিচয়ের সঙ্গে এতটাই নিবিড়ভাবে যুক্ত যে তাদের পুরোপুরি রক্তমাংসের মানুষ বলে মনে হয় না। এটি ছোটখাটো হলেও পুরো সিনেমায় ধারাবাহিক দুর্বলতা। ফলে গল্প বলার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাবণ চরিত্রে যশ। সিনেমার প্রথম পর্বে তাকে বেশ আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিশোধ ও সংযম—দুটি পরস্পরবিরোধী আদর্শের টানাপড়েন তাকে ভীতিকর এক রাজায় পরিণত করেছে। নিজের মনের মধ্যে থাকা দুটি ভিন্ন সত্তার মধ্য দিয়ে সেই দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেয়েছে। বাকি চরিত্রগুলোর মতো শুধু পৌরাণিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে রাবণের ব্যক্তিত্বকে আরো গভীরভাবে তুলে ধরেছেন নির্মাতারা। অন্য চরিত্রগুলোর মধ্যেও এমন বৈশিষ্ট্য থাকলে সিনেমাটি আরো সমৃদ্ধ হতে পারত।

বনবাসে রাম, সীতা ও লক্ষণ
সামগ্রিকভাবে অভিনয়শিল্পীদের পারফরম্যান্স ভালো। বিশেষ করে চাপা ব্যঙ্গাত্মক অভিনয় দিয়ে দর্শককে আনন্দ দিয়েছেন লক্ষ্মণ চরিত্রে রবি দুবে। তবে চরিত্রগুলোর গভীরতা আরেকটু বাড়ানো গেলে দর্শকের সঙ্গে তাদের আবেগের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হতে পারত। গল্পে তারা যে ভূমিকা পালন করছে, এর বাইরে ব্যক্তি হিসেবেও তাদের প্রতি দর্শকের আগ্রহ তৈরি হতো।
সিনেমা দেখতে গিয়ে রামের পক্ষ নিতে হয়, কারণ গল্পটি দর্শককে সেদিকেই নিয়ে যায়। কিন্তু সীতার সঙ্গে যে নীরব রোমান্টিকতা, শেষ দিকে নিজের মধ্যে চেপে রাখা যে ক্রোধ প্রকাশ পায়, সেগুলো আরো বিস্তৃতভাবে দেখানো হলে চরিত্র হিসেবে রামের প্রতি দর্শকের টান তৈরি হতো। এই সীমাবদ্ধতা সিনেমাটির গল্প বলার সম্ভাবনাকে কিছুটা খর্ব করেছে।
নির্মাতাদের গভীর ভালোবাসা ও আবেগের ফসল ‘রামায়ণ: রাইজ অব আ লেজেন্ড’, তা স্পষ্ট। বিশাল বাজেট ও জাঁকজমকপূর্ণ নির্মাণের মধ্যেও মহাকাব্যিক সিনেমার জন্য প্রয়োজনীয় আন্তরিকতা ধরে রাখা গেছে। দৃশ্য ও নির্মাণের অভিজ্ঞতার দিক থেকে ফ্যান্টাসি ঘরানার যেকোনো ধ্রুপদি চলচ্চিত্রের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে সিনেমাটির।
এ ধরনের মহাকাব্যিক চলচ্চিত্রের সফল উদাহরণ হলো পিটার জ্যাকসনের ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’ ট্রিলজি, যার বিশেষত্ব হলো চরিত্রের গভীরতা। সেই গভীরতা দর্শককে গল্পের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত করে। আখ্যানের মধ্যে মানবিক অনুভূতির এমন উপস্থিতি তৈরি করে, যাতে দর্শক চরিত্রগুলোর পরিণতি নিয়ে সত্যিকার অর্থেই ভাবতে শুরু করেন।
‘রামায়ণ’-এ শেষের দিকের একটি মৃত্যু এ সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে দেয়। যুদ্ধের দৃশ্য ও পরবর্তী মৃত্যু পর্দায় চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হলেও যতটা আবেগ তৈরি হওয়ার কথা, ততটা হয় না। ওই চরিত্রটির সঙ্গে অন্যদের সম্পর্ক এবং তার মহৎ উদ্দেশ্যের বাইরে তাকে নিয়ে দর্শকের আবেগী হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ তৈরি করা হয়নি।
এসব সীমাবদ্ধকে বোধগম্য করতে আরো উপযুক্ত তুলনা হতে পারে দুই পর্বে নির্মিত তেলুগু চলচ্চিত্র ‘বাহুবলী’। বিশাল মহাকাব্যিক আয়োজন সত্ত্বেও চরিত্রের আবেগ, ব্যক্তিত্ব ও সম্পর্ককে ভালোভাবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন এস এস রাজামৌলি। ফলে চরিত্রগুলোর পরিণতি দর্শকের কাছে বেশি অর্থবহ হয়ে উঠেছিল।
কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ‘রামায়ণ: রাইজ অব আ লেজেন্ড’ দারুণ দৃশ্যায়নের একটি মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র। বড় পর্দায় দেখার জন্য অবশ্যই বিবেচনায় রাখা যায়। সিনেমাটির দ্বিতীয় পর্ব আসবে সামনে। আশা করা যায়, সিকুয়েলে নির্মাতারা বিশাল আয়োজন অক্ষুণ্ন রেখেই চরিত্রগুলোর গভীরতা বাড়াতে পারবেন। তেমনটা হলে এ ঘরানার চলচ্চিত্রের কাঙ্ক্ষিত উচ্চতায় পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে ‘রামায়ণ’-এর।
রিভিউ লিখেছেন ব্র্যান্ডন জ্যাকারি















