চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাস শেষে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলারের ঘরে। সে হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) তথ্য প্রকাশ করেছে গতকাল। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ আট মাসে ৪ হাজার ৬১৭ কোটি বা ৪৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। বিপরীতে রফতানি হয়েছে ২৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। সে হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারে। গত বছরের একই সময়ে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১৩ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ৩ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, চলতি অর্থবছরে রফতানি আয় কিছুটা নিম্নমুখী। বিপরীতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। তবে সামগ্রিকভাবে দেশের বিওপি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। বিরাজমান বৈশ্বিক অস্থিতিশীল পরিবেশে এটি অর্থনীতির জন্য ভালো সংবাদ। এক্ষেত্রে প্রবাসীদের পাঠানো রেকর্ড রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শুরুতে জুলাইয়ে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরের আট মাসই ছিল নেতিবাচক। বিশেষ করে সর্বশেষ মার্চে রফতানি কমেছে ১৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গত বছরের মার্চে যেখানে ৪২৪ কোটি ৮৬ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছিল, এবার তা কমে ৩৪৮ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার ডলারে নেমেছে। এর আগে ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারিতেও রফতানি কমেছিল যথাক্রমে ১২ দশমিক শূন্য ৩ ও দশমিক ৫০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশ থেকে রফতানি হয়েছিল ৩০ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এ রফতানি ২৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছে। সে হিসাবে রফতানি আয় কমেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারির পর মার্চে রফতানি পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। এ কারণে মার্চে বিওপিতে বাণিজ্য ঘাটতি আরো বাড়বে।

দেশের রফতানি কমলেও আমদানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশের আমদানি ব্যয় হয়েছিল ৪৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয়ের পরিমাণ ৪৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে।

রফতানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হলেও বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে দেশের প্রবাসী আয়ের প্রবাহে। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে প্রবাসী আয় এসেছিল ১৮ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার। সেখানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে। সে হিসাবে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২১ শতাংশের বেশি।

মূলত রফতানিতে নেতিবাচক সময়েও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধিই চলতি হিসাবের ভারসাম্যকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রেখেছে। একই সঙ্গে স্থিতিশীল হয়েছে দেশের রিজার্ভও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারে (বিপিএম৬ হিসাবায়ন পদ্ধতিতে ২৯ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার)।

এদিকে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও প্রথম আট মাসে সার্বিক বিওপিতে উদ্বৃত্ত আছে ৩ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময়ে ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা রাষ্ট্রের আর্থিক হিসাবেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম আট মাসে যেখানে আর্থিক হিসাবে ৪৩ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত ছিল, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে সেখানে উদ্বৃত্ত আছে ৪০৮ কোটি ডলার।