সে চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে রাজধানীতে ৮০-১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে রসাল ফল তরমুজ। অথচ খেতে বিক্রি হচ্ছে পিস হিসেবে। যেগুলোর দাম গড়ে ১৮০-২৫০ টাকা। সেগুলোই রাজধানীর বাজারে কেজি হিসেবে ৫০০-৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে দামের এ বিস্ময়কর ফারাক নিয়ে বাড়ছে অসন্তোষ। ভোক্তারা বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের লাগামহীন মুনাফার বোঝা তাদের ঘাড়ে পড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজার তদারকির কথা বলছেন তারা। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তাদেরও কেজি দরে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
পটুয়াখালী বাংলাদেশের তরমুজ উৎপাদনের শীর্ষ জেলাগুলোর একটি। জেলার গলাচিপা উপজেলার চর কাজলে ৫১ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন মো. এমাদুল ইসলাম। চাষের পাশাপাশি তিনি তরমুজ ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন।
তিনি বণিক বার্তাকে জানান, পটুয়াখালীতে কৃষক পর্যায়ে তিন-সাত কেজি ওজনের তরমুজের প্রতি পিসের গড় দাম ১৮০-২২০ টাকা। ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছতে ট্রাক, লঞ্চ, ঘাট, শ্রমিক, আড়তসহ সব ধরনের খরচ মিলিয়ে প্রতি পিসে গড়ে ২৫ টাকা ব্যয় হয়। সে হিসেবে পটুয়াখালীর প্রতি পিস তরমুজ খেত থেকে ঢাকার বাজারে আসতে গড়ে খরচ হয় ২০৫-২২৫ টাকা। অথচ খুচরা পর্যায়ে তিন-আট কেজি ওজনের তরমুজের দাম গড়ে ২৪০-৬৪০ টাকা (প্রতি কেজি ৮০ টাকা হিসেবে)।
মো. এমাদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পটুয়াখালীতে তিন-সাত কেজি ওজনের তরমুজ পাইকারি বাজারে গড়ে প্রতি পিস ১৮০-২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকায় নিতে সব মিলিয়ে প্রতি পিসে আরো ২৫ টাকা খরচ হয়। তবে পরিবহন, দেরিতে বিক্রিসহ নানা কারণে তরমুজের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। সেজন্য ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কাটাতে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। তবে খুচরা পর্যায়ে ৮০ বা ১০০ টাকা কেজি এটি অতিরিক্ত।’
একই জেলার আব্দুস জামাল ঢাকায় এনে পাইকারি দরে তরমুজ বিক্রি করেছেন। বড় আকারের (ছয়-আট কেজি) ওজনের প্রতি কেজি ৬০ টাকা, মাঝারি আকারের ৫০ টাকা এবং ছোট আকারের (তিন-চার কেজি) তরমুজ প্রতি কেজি ৪২ টাকায় তিনি বিক্রি করেন। তবে রাজধানীতে খুচরা পর্যায়ে সব তরমুজের দামই ৮০ টাকার ওপরে।
একই জেলার কলাপাড়া ও চর কাজলে ৩৪ একর তরমুজের আবাদ করেছেন মো. দুলাল জমাদ্দার। সম্প্রতি তিনি নিজ জেলায় ছয়-আট কেজি ওজনের তরমুজ গড়ে ৩৬০ টাকা, পাঁচ কেজির বেশি ওজনের গুলো গড়ে ৩৩০ টাকায় বিক্রি করেছেন।
কৃষক ও তথা উৎপাদন পর্যায়ে দাম কম হলেও রাজধানী ঢাকায় এত বেশি দাম হওয়ার কারণ কী হতে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন বাজারে দাম বেশি। সেজন্য কিছু অসৎ চাষী, অসৎ ব্যবসায়ীর প্ররোচনায় কাঁচা তরমুজ তুলে ফেলছে। ফলে পরিপক্ব না হওয়ায় ১০০ পিসের মধ্যে কখনো ২০-২৫টি পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে ক্ষতি কাটাতে ব্যবসায়ীরা বেশি দামে বিক্রি করেন। তবে পাইকারি থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফা আদায় করছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যেটা আনুমানিক ৫০ টাকা কেজি বিক্রি করছি, সেটির দাম ১০ বা ২০ টাকা বেশি হতে পারে। কিন্তু দ্বিগুণ হওয়াটা অযৌক্তিক। ৯০ বা ১০০ টাকা কেজি এটা অত্যধিক।’
গত দুদিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নতুন বাজার, বাড্ডা, হাতিরপুল ঘুরে দেখা যায় সব বিক্রেতাই প্রতি কেজি তরমুজ ৮০ টাকা কেজির ওপরে বিক্রি করছেন।
গত সপ্তাহে রাজধানীর নতুন বাজার এলাকায় রাতে ভ্যানগাড়িতে তরমুজ বিক্রি করছিলেন রেজাউল ইসলাম। দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তরমুজ প্রতি কেজি ৯০ টাকায় বিক্রি করছি। সব জায়গায়ই এ দামে বিক্রি হচ্ছে। আমরা বেশি দাম দিয়ে আড়ত থেকে নিচ্ছি। খুবই কম লাভে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারে তরমুজ কম। রমজান মাস হওয়ায় চাহিদা বেশি।’
কারওয়ান বাজারের এক দোকানি বলেন, ‘তরমুজের সিজন শুরু হয়নি এখনো। আগাম লাগানো কিছু পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় কৃষক পর্যায় থেকেই দাম বেশি।’ কৃষক পর্যায়ে পিস হিসেবে বিক্রি হলেও খুচরা পর্যায়ে কেজি হিসেবে বিক্রির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘পিস হিসেবে বিক্রি করলেও সেগুলো আনুমানিক ওজন হিসেব করেই বিক্রি হয়। তাছাড়া আমাদের পাইকারি বাজার থেকে কেজি হিসেবে কিনতে হয়। এজন্য পিস হিসেবে বিক্রির সুযোগ নেই। আনুমানিক হিসেবে নিলে ভোক্তার লোকসানের ঝুঁকি থাকে, কেজি হিসেবে কিনলে সেটি থাকে না।’
এদিকে তরমুজের উচ্চ দাম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাড্ডা এলাকায় রাজু আহমেদ নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘৮০ টাকা কেজি এটা অত্যধিক। বিক্রেতারা জানে রজমান মাসে গরম পড়লে তরমুজের চাহিদা বাড়বে। সেজন্য দাম বেশি হলেও বিক্রি হবে। তাদের কাছে ভোক্তারা জিম্মি হয়ে আছে।’ বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য জানতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদকে একাধিকবার মোবাইলে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।










