অস্ট্রেলিয়ার জাদুঘরে প্রায় ৮০ বছর ধরে প্রদর্শিত হয়েছে কঙ্কালটি। কখনো ছোট একটি চেয়ারে এক পা তুলে বসা, কখনো পেছন দিকে ঘুরে চেয়ারের ওপর হাত রাখা অবস্থায়। প্রসারিত এক হাতে বসানো ছিল পাখির কঙ্কাল। পাশে ছোট্ট একটি পরিচিতি—মানুষ, হোমো স্যাপিয়েন্স। চারপাশে বিভিন্ন প্রাণীর কঙ্কালের ভিড়ে তিনিও আরেকটি প্রদর্শনীর বস্তু।

না, কঙ্কালটি অজানা কোনো মানুষের নয়, তার নাম জোহান ডেভিড ম্যাক্স ড্রেইসিগ। জার্মানিতে জন্ম নেয়া ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের (১৮৭০-৭১) এ বীর সেনা সাহসিকতার জন্য পেয়েছিলেন মর্যাদাপূর্ণ আয়রন ক্রস পদক। অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসী হওয়ার পর দেশটির জার্মান সমাজেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

১৯১৩ সালে মৃত্যুর পর তার পরিণতি হয়েছিল অদ্ভুত, কবরের বদলে জায়গা হয় জাদুঘরে। আর ১১৩ বছর পর, গতকাল অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে সমাহিত হন ম্যাক্স।

মরদেহের মালিক হন চিকিৎসক

৬২ বছর বয়সে ক্যানসারে মারা যান ম্যাক্স। দাবি করা হয়, মৃত্যুর আগে চিকিৎসক অধ্যাপক আর্চিবল্ড ওয়াটসনের হাতে দেহ তুলে দিয়েছিলেন এ জার্মান। তবে অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অ্যানাটমির অধ্যাপকের কাছে মরদেহের মালিকানা থাকা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।

ম্যাক্সের দেহকে কঙ্কালে পরিণত করেন ওয়াটসন। পরে ১৯২০ সালে মাত্র ১০ পাউন্ডে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া জাদুঘরের কাছে বিক্রি করেন।

max3

জোহান ডেভিড ম্যাক্স ড্রেইসিগ

জাদুঘরের প্রত্যাবাসনবিষয়ক ব্যবস্থাপক আনা রুশো ম্যাক্সের শেষকৃত্যে বলেন, ‘১৯১৩ সালে নর্থ অ্যাডিলেড হাসপাতালের মৃত্যুশয্যায় ম্যাক্স ও ডা. ওয়াটসনের মধ্যে কী কথাবার্তা হয়েছিল, তা আমরা জানি না। তবে সে সময়ের আইন কী ছিল, তা জানি। তখন মানুষের পক্ষে নিজের চিকিৎসকের কাছে দেহ দান করার সুযোগ ছিল না।’

রুশোর মতে, ওয়াটসন, হাসপাতাল এবং জাদুঘর—সবারই বিষয়টি জানার কথা ছিল। তিনি বলেন, ‘ম্যাক্সের গল্প এবং সেই সময়ের ইতিহাস জানার পর তার প্রতি মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শনের অর্থ কী, তা নিয়ে জাদুঘরকে গভীরভাবে ভাবতে হয়েছে।’

অদ্ভুত চিকিৎসক ওয়াটসন

ম্যাক্সের চিকিৎসক ওয়াটসনের জীবন ছিল রহস্যময়। খুন ও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মানুষ ধরে নিয়ে দাসশ্রমে নিয়োজিত করার অভিযোগে একসময় গ্রেফতারও হয়েছিলেন। জামিনে মুক্তি পেয়ে পালিয়ে জার্মানিতে যান এবং সেখানে চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন।

মানবদেহের বিভিন্ন অংশ সংগ্রহের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। অস্ত্রোপচারকক্ষ ও ময়নাতদন্তের ঘর থেকে দেহের বিভিন্ন অংশ সংগ্রহ করতেন ওয়াটসন। তবে সব সময় নিয়ম মেনে এসব কাজ করতেন না।

দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার জার্নাল অব দ্য হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ওয়াটসনের এসব কর্মকাণ্ডের বিবরণ দিয়েছেন লেখক জন হিলি।

হিলির ধারণা, ১৯১৩ সালে ম্যাক্সের শরীরে হয়তো একটি ‘বৈপ্লবিক ও পরীক্ষামূলক’ অস্ত্রোপচার করেছিলেন ওয়াটসন। সে সময় ম্যাক্স তীব্র বদহজম ও কোমরের নিচের দিকে ব্যথায় ভুগছিলেন। তার পাকস্থলীতে ক্যানসার শনাক্ত করেন ওয়াটসন। পরে ম্যাক্সের শরীরের মাংস ছাড়িয়ে কঙ্কাল প্রস্তুত করেন সাউথ অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়ামের ট্যাক্সিডার্মিস্ট জো রাউ।

watson

ডা. আর্চিবল্ড ওয়াটসন

যুদ্ধের বীর থেকে জাদুঘরের প্রদর্শনী

ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য আয়রন ক্রস পাওয়া এই জার্মান ১৮৮৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান ম্যাক্স। সেখানে লোহা ও ইস্পাতের ব্যবসায়ী হিসেবে সফলতা পান। অ্যাডিলেডের জার্মান প্রবাসী সমাজেও ছিলেন পরিচিত মুখ।

তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত শোকবার্তায় লেখা হয়েছিল, ‘মৃত ব্যক্তি আয়রন ক্রস অর্জনকারী অল্প কয়েকজন জীবিত যুদ্ধসেনার একজন ছিলেন। অ্যাডিলেডের দেশাত্মবোধক অনুষ্ঠানগুলোয় তাকে এই পদক অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে পরতে দেখার কথা অনেকেরই মনে থাকবে।’

১৯৯৮ সালের নিবন্ধে ম্যাক্সের তারুণ্যের একটি বর্ণনাও দিয়েছেন হিলি। তার ভাষায়, ম্যাক্স ছিলেন সুদর্শন, কিছুটা রোগা গড়নের এবং কালো ঢেউখেলানো চুলের অধিকারী। ব্রাইটন সমুদ্রসৈকতে শিশুদের গাধার পিঠে চড়াতেন তিনি। একটি ধূসর রঙের ঘোড়াও ছিল তার, নাম মেরি। একবার একটি মৃত পেঙ্গুইন এবং অন্যবার একটি পঙ্গপাল জাদুঘরে দান করেছিলেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ওয়াটসনের কোনো আলমারিতে পড়ে ছিল ম্যাক্সের কঙ্কাল। পরে জাদুঘরে অন্য হাড়গোড়ের সঙ্গে পর্দার আড়ালে অবহেলায় পড়ে থাকে সেটি। এসব হাড়ের বেশির ভাগই ছিল অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী এবং টরেস প্রণালির দ্বীপবাসীদের।

১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে শিক্ষার্থীদের মানবদেহের গঠন শেখানোর জন্য ম্যাক্সের কঙ্কাল প্রদর্শনীতে রাখা হয়। প্রথমে কাচের বাক্সে এককভাবে প্রদর্শিত হলেও পরে অন্যান্য মানুষের ও প্রাণীর কঙ্কালের সঙ্গে রাখা হয় তাকে।

২০০৯ সালে জার্মানির এক পর্যটক জাদুঘরে ম্যাক্সের কঙ্কালের এমন প্রদর্শনী দেখে ক্ষুব্ধ হন। বিষয়টি তিনি জার্মান সরকারকে জানান। এতে ম্যাক্স প্রায় একটি কূটনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছিলেন। ২০১৯ সালে শেষ পর্যন্ত প্রদর্শনী থেকে সরিয়ে নেয়া হয় কঙ্কালটি।

max1

জোহান ডেভিড ম্যাক্স ড্রেইসিগের শেষকৃত্য

অবশেষে মর্যাদার সঙ্গে সমাহিত

ম্যাক্সের কোনো উত্তরসূরি বা জীবিত আত্মীয়স্বজন আছেন কিনা, তা জানতে কয়েক মাস ধরে কাজ করেন আনা রুশো ও সাউথ অস্ট্রেলিয়ান জার্মান অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা। কিন্তু কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ১৯৬০ সালেই তার পারিবারিক বংশধারা শেষ হয়ে গিয়েছিল।

অবশেষে জাদুঘর ও অ্যাডিলেডের জার্মান বংশোদ্ভূতদের উদ্যোগে তার সমাধির ব্যবস্থা করা হয়। ওয়েস্ট টেরেস সমাধিক্ষেত্রে জার্মান পতাকায় মোড়ানো ছোট একটি কফিনে তাকে সমাহিত করা হয়। লুথারান ধর্মযাজক শেষকৃত্যের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। পরে অ্যাডিলেডের জার্মান ক্লাবে আয়োজিত স্মরণসভায় জীবন, মৃত্যু ও দীর্ঘ পরবর্তী যাত্রার কথা স্মরণ করা হয়।

১১৩ বছর পর ম্যাক্সের দেহাবশেষ অবশেষে ফিরে পেল সমাধি। যে মানুষটি একসময় যুদ্ধের সাহসিকতার জন্য পদক পেয়েছিলেন, অস্ট্রেলিয়ায় গড়ে তুলেছিলেন নিজের জীবন, মৃত্যুর পর তাকেই দীর্ঘদিন কাটাতে হয়েছে কাচের বাক্সে বন্দী হয়ে। এবার সেই অধ্যায়ের অবসান। জাদুঘরের চেয়ারম্যানের শেষ কথাটি তাই হয়ে উঠেছে এই দীর্ঘ যাত্রার সবচেয়ে অর্থবহ বিদায়—ম্যাক্স এখন তার প্রাপ্য মর্যাদায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আশা করি, এবার তিনি শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন।