চলতি বছরের জুনে সদরঘাটে লঞ্চডুবির ঘটনায় উদ্ধারকাজে অংশ নিতে আসা একটি জাহাজের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঢাকার পোস্তগোলা সেতু। এর পর থেকে সেতুটি দিয়ে সীমিত পরিসরে যানবাহন চলছে। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে থাকা সেতুটি এখনো রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সারা দেশে এমন ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ও কালভার্টের সংখ্যা ৫ হাজার ২৬। হালকা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে আরো প্রায় তিন হাজার সেতু।
দেশের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক ঢাকা-চট্টগ্রাম-টেকনাফ। ঢাকা-চট্টগ্রাম অংশ চার লেনে হয়েছে বছর তিনেক আগে। নতুন করে নির্মিত হওয়ায় এ অংশে একটিও ঝুঁকিপূর্ণ সেতু নেই। তবে মহাসড়কটির চট্টগ্রাম-টেকনাফ অংশে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর সংখ্যা ১৭। এ তালিকায় কক্সবাজারের চকরিয়ায় ৩০০ মিটার দীর্ঘ মাতামুহুরী সেতুও রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এ সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে জাপানের অর্থায়নে, যার কাজ ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা।
ঢাকা-সিলেট-তামাবিল জাতীয় মহাসড়কও চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। তবে চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ কেবল প্রাথমিক পর্যায়ে। এ মহাসড়কটিতে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ও কালভার্টের সংখ্যা ৫১। একইভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ৪০, জয়দেবপুর-জামালপুর মহাসড়কে ২০, ঢাকা-রংপুর-পঞ্চগড় মহাসড়কে ১০৭, সিরাজগঞ্জ-রাজশাহী মহাসড়কে ৪, রাজবাড়ী-খুলনা মহাসড়কে ৪৮ ও ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে ৫৫টি ঝুঁকিপূর্ণ সেতু রয়েছে। এ চিত্র দেশের প্রধান আটটি জাতীয় মহাসড়কের। বাকি জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়কে বিদ্যমান সেতুগুলোর অবস্থা আরো করুণ।
দীর্ঘদিন ধরেই নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের শেরপুর সেতু। সওজ বিভাগ সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়া জানিয়েছেন, এ সেতুটি অনেক পুরনো। ভারী যানবাহন যেমন এ সেতু দিয়ে চলাচল করছে, তেমনি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত গাড়িও চলছে। কয়েক দফায় সেতুটির স্ল্যাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি মেরামতের মাধ্যমে সেতু যান চলাচলের উপযোগী রাখার। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বর্তমানে এ সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে বলে জানান তিনি।
দেশের কোন সেতু কী অবস্থায় রয়েছে, তা জানতে একটি সফটওয়্যার চালু করেছে সওজ অধিদপ্তর। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সহায়তায় আওতাধীন সেতুগুলোর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে ‘ব্রিজ মেইনটেন্যান্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ বা বিএমএমএস নামের এ সফটওয়্যারে। তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম শুরুর পর থেকে নতুন-পুরনো মিলিয়ে ২১ হাজার ৪৯২টি সেতুর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি।
‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’ ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে এসব সেতুকে। এর মধ্যে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকা সেতুর সংখ্যা ১৩ হাজার ৫৩৩। এ সেতুগুলো ভালো অবস্থায় রয়েছে। ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে ২ হাজার ৯৩৩টি সেতু। এগুলো হালকা ক্ষতিগ্রস্ত। ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে ‘মেজর এলিমেন্টাল ড্যামেজ’ থাকা সেতুগুলোকে। এ ধরনের সেতুর সংখ্যা ৩ হাজার ৯৩০। আর ‘ডি’ ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে ‘মেজর স্ট্রাকচারাল ড্যামেজ’ থাকা সেতুগুলোকে। সওজ অধিদপ্তরের নেটওয়ার্কে থাকা ‘ডি’ ক্যাটাগরির সেতুর সংখ্যা ১ হাজার ৯০। ‘সি’ ও ‘ডি’ ক্যাটাগরিতে থাকা ৫ হাজার ২৬টি সেতু ও কালভার্ট রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা ৭৫২টি সেতুর অবস্থান জাতীয় মহাসড়কে। আঞ্চলিক মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু আছে ১ হাজার ১৯৩টি। আর বাকি ৩ হাজার ৮১টি সেতুর অবস্থান দেশের জেলা মহাসড়কগুলোতে।
বন্যা, নকশা ও নির্মাণত্রুটি, গাড়ির ধাক্কা, অতিরিক্ত ওজনের গাড়ি চলাচলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক-মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণে সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন সওজ অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা। তবে সেতু যে কারণেই ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠুক না কেন, সেটি মেরামতের উদ্দেশ্যে এ তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ব্রিজ ম্যানেজমেন্ট উইং) শিশির কান্তি রৌথ সওজের পরিকল্পনা, নিরীক্ষণ ও মূল্যায়ন সার্কেলে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পরে যোগাযোগ করা হলে পরিকল্পনা, নিরীক্ষণ ও মূল্যায়ন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু হেনা মোহাম্মদ তারেক বণিক বার্তাকে বলেন, শুরুতে জাইকার সহায়তায় সেতুগুলোর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বর্তমানে নিজস্ব অর্থায়নে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো সেতুগুলোর হেলথ মনিটরিং। সেতুগুলোর বর্তমান অবস্থা নিরূপণ করা। সেতুগুলোর বাস্তব অবস্থা জেনে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ বা সংস্কারে কী ধরনের অর্থ ব্যয় হবে, তার একটা ধারণাও পাওয়া যাবে এ কার্যক্রমের মাধ্যমে। এতে পরবর্তী সময়ে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত কিংবা পুনর্নির্মাণের মতো সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা যাবে।
সফটওয়্যারে সেতুর তথ্য হালনাগাদের এ প্রক্রিয়াটি চলমান থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটা সেতু যেকোনো সময় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হয়তো আজ ভালো, দুদিন পর প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট কারণে কোনো সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এটা যেন তাত্ক্ষণিকভাবে আমরা ওয়াকিবহাল থাকতে পারি, তার জন্যই বিএমএমএস সফটওয়্যারের এ উদ্যোগ।










