মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে দেশীয় মাছ ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) একটি গবেষণা। গবেষণায় দেখা গেছে, মশার লার্ভা খাওয়ার ক্ষেত্রে দেশীয় নাপিত খয়রা মাছ বিদেশি গাপ্পি মাছের তুলনায় বেশি কার্যকর। গবেষণাগারে পরিচালিত পরীক্ষায় ২৪ ঘণ্টায় একটি নাপিত খয়রা মাছ গড়ে প্রায় ৯৪টি মশার লার্ভা খেয়েছে। একই সময়ে গাপ্পি মাছ খেয়েছে গড়ে ৫৬টির মতো।
জাবি অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত এ গবেষণায় দেশীয় তিন প্রজাতির মাছ নাপিত খয়রা, জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্স-এর মশার লার্ভা খাওয়ার সক্ষমতা বিদেশি গাপ্পি মাছের সঙ্গে তুলনা করা হয়। পাশাপাশি দূষিত পানিতে মাছগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতা এবং বিকল্প খাবারের উপস্থিতিতে মশার লার্ভার প্রতি তাদের খাদ্যপছন্দও পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, স্বাভাবিক পানিতে নাপিত খয়রা মাছ গড়ে ৯৪ দশমিক ৫টি এবং দূষিত পানিতে ৯৩ দশমিক ৭৫টি লার্ভা খেয়েছে। জেব্রাফিশ স্বাভাবিক পানিতে গড়ে ৮৭টি এবং দূষিত পানিতে ৮৬ দশমিক ২৫টি লার্ভা খেয়েছে। ব্লু পাঞ্চাক্সের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা যথাক্রমে ৮০ দশমিক ৭৫ ও ৭৮ দশমিক ৭৫। অন্যদিকে, বিদেশি গাপ্পি মাছ স্বাভাবিক পানিতে গড়ে ৫৬ দশমিক ৫টি এবং দূষিত পানিতে ৬১ দশমিক ৫টি লার্ভা খেয়েছে। অর্থাৎ, পরীক্ষায় অংশ নেয়া চার প্রজাতির মধ্যে নাপিত খয়রা মাছের লার্ভা খাওয়ার সক্ষমতা ছিল সর্বোচ্চ।
গবেষণায় আরো দেখা যায়, স্বাভাবিক ও দূষিত পানিতে চার প্রজাতির মাছের লার্ভা খাওয়ার হারে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল না। এ ফলাফল থেকে গবেষকেরা ধারণা করছেন, পরীক্ষার নির্দিষ্ট পরিবেশে মাছগুলো দূষিত পানিতেও মশার লার্ভা খেতে সক্ষম।
গবেষণার আরেকটি অংশে মশার লার্ভার পাশাপাশি অন্যান্য খাবার থাকলে মাছগুলো কোন খাবার বেশি পছন্দ করে, তা পরীক্ষা করা হয়। এ জন্য দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ের মশার লার্ভা, টিউবিফেক্স কৃমি এবং কৃত্রিম মাছের খাবার ব্যবহার করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, নাপিত খয়রা, জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্স মাছ অন্যান্য খাবারের তুলনায় মশার লার্ভার প্রতি বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। বিশেষ করে ব্লু পাঞ্চাক্স তৃতীয় পর্যায়ের লার্ভার প্রতি সর্বোচ্চ খাদ্যপছন্দ প্রদর্শন করেছে। নাপিত খয়রা মাছের পছন্দ ছিল দ্বিতীয় পর্যায়ের লার্ভা। তবে গাপ্পি মাছের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো খাবারের প্রতি উল্লেখযোগ্য পছন্দ পাওয়া যায়নি। কৃত্রিম মাছের খাবারের প্রতিও তাদের আগ্রহ দেখা গেছে।
দূষিত পানিতে মাছগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতা যাচাই করতে ১০ দিন ধরে পরীক্ষা চালানো হয়। এতে চার প্রজাতির সব মাছই বেঁচে ছিল। এ সময় জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্সের ওজনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
তবে গবেষকেরা জানান, দূষিত পানিতে মাছগুলো কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। ফলে স্বল্পমেয়াদি পরীক্ষায় বেঁচে থাকার তথ্যকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সহনশীলতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
গবেষণার মূল উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে অধ্যাপক কবিরুল বাশার জানান, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ফাইলেরিয়াসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। দীর্ঘদিন ধরে মশা নিয়ন্ত্রণে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হলেও এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে মশার মধ্যে কীটনাশক প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশ, মানুষ ও অন্যান্য উপকারী প্রাণীর ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে মশার লার্ভা খেয়ে বেঁচে থাকা মাছ বা লার্ভিভোরাস ফিশকে জৈবিক নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাময় পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, গবেষণাগারের ফলাফল সরাসরি বাস্তব পরিবেশে প্রয়োগের নিশ্চয়তা দেয় না। নর্দমা বা জলাশয়ের পানির গুণাগুণ, অক্সিজেনের পরিমাণ, পানির প্রবাহ, অন্যান্য খাবারের প্রাপ্যতা এবং মাছের প্রজনন ও টিকে থাকার সক্ষমতা মাঠপর্যায়ে কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই বৃহৎ পরিসরে ব্যবহারের আগে বিভিন্ন ধরনের নর্দমা ও জলাশয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা প্রয়োজন।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে নাপিত খয়রা মাছের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্সও কার্যকর জৈবিক নিয়ন্ত্রণের উপাদান হতে পারে। তবে কোন পরিবেশে কোন প্রজাতির মাছ ব্যবহার উপযোগী, তা আরো গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো একক পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব জৈবিক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। দেশীয় মাছের কার্যকারিতা মাঠপর্যায়ে প্রমাণিত হলে তা রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও সহায়ক হতে পারে।
গবেষণায় ব্যবহৃত মশার লার্ভা সংগ্রহ করা হয় ঢাকার সাভার এলাকার বিভিন্ন নর্দমা থেকে। গবেষণাগার ও সেমিফিল্ড পর্যায়ে বিভিন্ন পরীক্ষা পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি মাছকে আলাদা পাত্রে রেখে স্বাভাবিক ও দূষিত পানিতে লার্ভা খাওয়ার সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়।
এ সময় প্রতিটি পাত্রে ১০০টি করে কিউলেক্স মশার তৃতীয় পর্যায়ের লার্ভা দেয়া হয়। ২৪ ঘণ্টা পর অবশিষ্ট লার্ভা গণনা করে মাছের খাদ্যগ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে মশা নিয়ন্ত্রণে অতীতে বিদেশি গাপ্পি মাছ ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও বিভিন্ন সময়ে নর্দমায় গাপ্পি মাছ ছেড়েছে। তবে গবেষণার ফলাফল বলছে, মশার লার্ভা খাওয়ার ক্ষেত্রে দেশীয় কয়েকটি মাছ গাপ্পির তুলনায় বেশি কার্যকর হতে পারে। বিশেষ করে দেশীয় প্রজাতি ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর বিদেশি প্রজাতির সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাবের ঝুঁকি এড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
গবেষণায় বিদেশি মশাখেকো মাছের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে অন্যান্য দেশে পরিবেশগত সমস্যা সৃষ্টির উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে।









