গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে। প্রতিদিনই হাসপাতালগুলোয় বাড়তে থাকে ডেঙ্গু রোগীর ভিড়, সঙ্গে মৃত্যুও। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত তথ্য সরকার প্রকাশ করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত ডেঙ্গু-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানের সঙ্গে হাসপাতালগুলো থেকে পাওয়া তথ্যে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যের এ অসংগতি ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আড়াল করার পাশাপাশি এর ব্যবস্থাপনাকেও আরো জটিল করে তুলতে পারে।
দেশের অন্যতম বড় চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল। সারা দেশ থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত সংকটাপন্ন রোগীরা চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালে ভর্তি হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢামেক হাসপাতালে ডেঙ্গু নিয়ে মোট ১ হাজার ৭৬১ জন ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুজনিত কারণে মারা গেছে ২৬ জন।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম ফরহাদ হোসেন বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৪৭৩ জন এবং মারা গেছে ৩৫ জন।
অর্থাৎ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যের তুলনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ভর্তি রোগীর তথ্য ১ হাজার ২৮৮ জন বেশি। অন্যদিকে হাসপাতালের হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে নয়জন বেশি।
শুধু সামগ্রিক হিসাবেই নয়, প্রতিদিন হাসপাতালে কত ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল সে তথ্যেও দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল দেখা গেছে। ঢামেক কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ১-১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৪১, ১৪১, ১৫৩, ১৭৫, ১৯৩, ১৮৫, ৯১, ১৭৩, ১৯৯, ২০৫, ২০৪, ২২৮, ২১১ ও ১৯১। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১-১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিনই ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৭২ জন করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যের তুলনায় এ সংখ্যা অনেক কম।
একই ধরনের গরমিল দেখা গেছে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যেও। হাসপাতালটির উপপরিচালক ডা. মো. নুরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১-৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিনই হাসপাতালটিতে দেড় শতাধিক ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল। এ সাতদিনে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৭৭, ১৮০, ১৮০, ১৭৯, ১৯২, ২০০ ও ১৯০। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, প্রথম পাঁচদিন মুগদা হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৫২ জন করে এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম দিনে ছিল ৪৯ জন করে।
নতুন ভর্তি রোগীর তথ্যেও দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। মুগদা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ১-৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৪৭, ৪১, ৫২, ৬৯, ৩৬, ৬৬ ও ৫৩। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর ৩৩, ২ সেপ্টেম্বর ২২, ৩ সেপ্টেম্বর ২৭, ৪ সেপ্টেম্বর ২৮, ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর শূন্য এবং ৭ সেপ্টেম্বর ২৯ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। অর্থাৎ এ সাতদিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে দৈনিক গড়ে ৩০ জনেরও কম নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে ৮-১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্তও মুগদা হাসপাতালে দৈনিক গড়ে ৩০ জনের কম নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তির তথ্য দেয়া হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে এবং এ সময়ে প্রতিদিন কমপক্ষে ৭০ জন করে নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে।
দেশে যখনই কোনো সংকট দেখা দেয়, তখনই স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রকৃত তথ্য নিয়ে একধরনের লুকোচুরি করা হয় বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালগুলোর প্রাথমিক ডেটার সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেটার বড় ধরনের অমিল হওয়াকে স্বাভাবিক মনে করছি না। এক-দুইদিনের তথ্যে ভুল হতে পারে। কারণ ডেটা মানুষই এন্ট্রি করে, আর মানুষমাত্রই ভুল হতে পারে। কিন্তু মাসের টানা ১২ দিন একটি নির্দিষ্ট হাসপাতালের, বিশেষ করে বড় হাসপাতালের তথ্যের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের গরমিল থাকা অস্বাভাবিক। আবার প্রতিদিন একই সংখ্যক রোগী দেখানো থেকে বোঝা যায়, তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে গাফিলতি রয়েছে অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রকৃত সংখ্যা আড়াল করতে চাইছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের সঙ্গে মিটফোর্ড হাসপাতালের ডেঙ্গু রোগীর পরিসংখ্যানেও ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। মিটফোর্ড হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক খোরশেদ মিনহাজুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১ সেপ্টেম্বর থেকে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ৩-৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাতদিনে হাসপাতালটিতে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭৬, ৬০, ৬৯, ৬৩, ৫১, ৬৪ ও ৭৩। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে দৈনিক গড়ে ৪০ জনেরও কম ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিল। অধিদপ্তরের হিসাবে, ৩-৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন ২৬ জন করে এবং ৬-১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন ২৯ জন করে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিল।’
ডেঙ্গু বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সময় প্রকৃত চিত্র কম দেখানোর প্রবণতার পেছনে সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার মানদণ্ড নিয়ে ভুল ধারণা কাজ করে বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। তার মতে, এ ভুল চিন্তা থেকেই সরকার অনেক সময় প্রকৃত তথ্য প্রকাশে পিছিয়ে যায়। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারো কারো ধারণা, ডেঙ্গু, হাম বা করোনার মতো বিপর্যয়ের পরিসংখ্যান ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেখালে হয়তো সরকারের ভাবমূর্তি বজায় থাকবে কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা পুরো ভিন্ন। সত্য কখনো গোপন থাকে না। বরং গোপন রাখার চেষ্টা করলে তা ফুলে-ফেঁপে আরো বড় হয়ে সামনে আসে। এমন পরিস্থিতিতে গুজবও ডালপালা বিস্তার করে। তাই হাসপাতালের প্রাথমিক ডেটার সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেটা কেন মিলছে না, সে বিষয়টি সরকারকে পরিষ্কার করা উচিত।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ দিনই একই সংখ্যক রোগী দেখানো হয়েছে। মাঝে মধ্যে সেই সংখ্যা সামান্য কমবেশি করা হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার।
বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ক্রমেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সঠিক তথ্য খুবই প্রয়োজন। বিশেষ করে ডেঙ্গুর হটস্পট নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সঠিক পরিসংখ্যানের বিকল্প নেই। এমন সময়ে যদি টানা ১২ দিন ঢাকা মেডিকেলে ৭২ জন করে রোগী ভর্তি দেখানো হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই মনে হবে পরিসংখ্যান ম্যানিপুলেট করা হয়েছে। এ বিষয়ে আরো গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজন। বিষয়টি সত্য হলে এটি জাতির সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা। প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে, আর সরকার যদি তথ্য গোপন করে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
হাসপাতালের তথ্যের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের অমিলের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো অসংগতি থাকলে তা অবশ্যই অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের দাবি রাখে। ডেঙ্গু বা জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নির্ভুল পরিসংখ্যান অত্যন্ত জরুরি। আমরা বিষয়টি যাচাই করে দেখব।’
গত ১-১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢামেক হাসপাতালে টানা ৭২ জন করে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি দেখানো এবং ডেঙ্গুর এ পিক সময়ে মুগদা হাসপাতালে কোনো কোনো দিন নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা শূন্য দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যদি এমনটি হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই কোথাও ভুল আছে। সেটা আপনাকেও যাচাই করতে হবে, আমাদের জায়গা থেকেও যাচাই করতে হবে। আমাদের ভুল হলে গণমাধ্যম সেটা ধরিয়ে দেবে, আমরা শুধরে নেব। বিষয়টি এমনই।’
সরকার ডেঙ্গুর তথ্য লুকাচ্ছে কিনা—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কথা অমূলক। গতকালই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে ছাড়িয়ে গেছে। আমরা তো সে তথ্য লুকাইনি। আমরা সতর্ক না থাকলে বর্ষার পর পরই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা গতবারের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেত।’
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় (রোববার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) ডেঙ্গুতে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭৩৩ জন। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ১৯১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯১ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩৮৮ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭০ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৪৩ জন, খুলনা বিভাগে ৩০২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১০ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৪৫ জন, রংপুর বিভাগে ৮৬ জন ও সিলেট বিভাগে সাতজন রয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ নিয়ে ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৩ হাজার ৫৭০ জন।










