কাজের সূত্রে রুবেল হোসেন (২৬) ছিলেন সৌদি আরবে আর মরিয়ম খাতুন (১৮) ছিলেন রাজশাহীর বাগমারায়। প্রায় সাত মাস আগে ভিডিও কলে দুজনের বিয়ে হয়। কথা ছিল দেশে ফিরেই ধুমধাম করে বৌ ঘরে তুলবেন রুবেল। মরিয়মও ছিলেন স্বামীর সঙ্গে সংসারের অপেক্ষায়। কিন্তু তার সেই আশা আর পূরণ হলো না। সৌদি আরবের কর্মক্ষেত্রে লাগা আগুন কেড়ে নিল প্রবাসী রুবেলের প্রাণ। আর সংসার শুরুর আগেই বিধবা হয়ে পড়লেন মরিয়ম। রাজধানী রিয়াদ থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে আল আহসা শহরের হুফুফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি এলাকায় শুক্রবার এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত রুবেল হোসেন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নের বারইপাড়া গ্রামের জফির উদ্দিনের ছেলে। স্বজনেরা জানান, ছয়-সাত বছর আগে সৌদি আরবে যান রুবেল হোসেন। সেখানে একটি সোফা কারখানায় তার সঙ্গে এলাকার আরো তিনজন চাকরি করতেন। বিদেশে থাকা অবস্থায় গত জানুয়ারিতে একই ইউনিয়নের ইব্রাহিম নগরের মঞ্জুর রহমানের মেয়ে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে বিয়ে হয় রুবেলের।

বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হয়নি মরিয়ম খাতুনের। শুধু ভিডিও কলের মাধ্যমে একে অন্যকে দেখেছেন তারা। মরিয়ম খাতুন জানান, প্রতিদিন একাধিকবার কথা হতো। ঘটনার দিন দুপুরে তার সঙ্গে শেষ কথা হয়। এরপর শুক্রবার রাতে সৌদি আরব থেকে রুবেলের এক সহকর্মী দুর্ঘটনার কথা জানান। শনিবার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হন তারা।

মরিয়ম আরো জানান, কিছুদিন আগে রুবেলের মা মারা যান। দেশের বাইরে থাকায় মাটিও দিতে পারেননি। এতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ছুটি পেলেই দেশে আসবেন বলে জানিয়েছিলেন রুবেল।

রুবেলের বাবা জফির উদ্দিন প্রতিবন্ধী। সত্তরোর্ধ্ব এ বৃদ্ধ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলে দেশে এলে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। আধাপাকা বাড়িটির পুরোটাই পাকা করার পরিকল্পনা ছিল। তবে তা আর হলো না।’ 

শুধু রুবেল হোসেনের বাড়ি নয়, মাতম চলছে বারইপাড়া গ্রামের সাজেদুল ইসলাম, আরিফ হোসেন ও বড় মাধাইমুড়ি গ্রামের ফিরোজ আলী সরদারের বাড়িতেও। তারাও সেখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। আরিফ হোসেন ওরফে রুবেল আলীর দেশে ফিরে বিয়ের কথা ছিল। এজন্য পরিবারের সদস্যদের পাত্রী দেখার কথাও বলেছিলেন। তবে তার আগেই আগুনে ঝলসে প্রাণ হারালেন তিনি। 

নিহত ফিরোজ আলী সরদার দুই শিশুকন্যাকে রেখে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। যাওয়ার আগে এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। সংসার চালানো তো দূরের কথা, এখন কীভাবে ঋণ শোধ হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় স্বজনরা।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক শামীম হোসেন শনিবার দিবাগত রাতে বাগমারায় যান। তিনি নিহত শ্রমিকদের বাড়ি গিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন। প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ হাজার করে টাকাও দেন জেলা প্রশাসক। ওই সময় দ্রুত মরদেহ দেশে আনতে উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান তিনি।