রাষ্ট্রীয় মদদে গত সাত মাসে দেশে কোনো গুম, খুন বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। একই সময়ে দেশে বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতার নজিরবিহীন পরিবেশ বজায় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সরকার ব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহ্দী আমিন বলেন, এ সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে সহনশীল পরিবেশ বজায় রয়েছে। ভিন্নমত ও সমালোচনার সুযোগও রয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা ও সমালোচনা করার সুযোগ থাকা জরুরি।

তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা ভুলত্রুটি ঘটলে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে।

জাতীয় সংসদের কার্যক্রম প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে অবাধ যুক্তিতর্কের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার চেষ্টা চলছে।

বিগত সরকারের সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি বলেন, আগের শাসনব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার সে ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি চায় না। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়নে শুধু সরকারের বক্তব্য যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিতে কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও শক্তিশালী আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই সনদের মূল প্রত্যাশা ছিল গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। বর্তমান সরকার নির্বাচনে জয়ী হয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় এবং শীর্ষ নেতৃত্বের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ ও চর্চায় আশাবাদ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, এটি রাষ্ট্র সংস্কারের একটি বড় সুযোগ।

তিনি বলেন, রাষ্ট্র কেবল কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছায় চলে না, পুরো সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, রাজনৈতিক ইকোসিস্টেমে অর্থ, পেশিশক্তি, ধর্ম, পুরুষতন্ত্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের আধিপত্য রয়েছে। এর সঙ্গে ‘বিজয়ী দলই সব পাবে’ ধরনের মানসিকতা যুক্ত হলে সুশাসনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হয়।

আইনি কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যে অধ্যাদেশগুলো নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সেগুলো কোনো প্রকার পরিবর্তন ছাড়াই আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার আইনি কাঠামো দুর্বল বা বাতিল করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, একটি কার্যকর সংসদ গঠনের পাশাপাশি নির্বাহী বিভাগকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করানোর মতো আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির, ডা. মনীষা চক্রবর্তী, ডা. তাসনীম জারাসহ শিক্ষাবিদ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।