চলমান সহিংস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এ অবস্থায় কার্যত স্থবির হয়ে হয়ে পড়েছে সারা দেশ। জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোয় রিকশা ও অটোরিকশা চলাচল করলেও দূরপাল্লার যানবাহন ছেড়ে যায়নি। রাস্তাঘাটও অনেকটা জনমানবশূন্য। তবে কোটা নিয়ে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের পর নতুন কোনো কর্মসূচি দেয়নি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এর পরও কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় রংপুরে এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মাদারীপুরে নাশকতার মামলায় চারজন গ্রেফতার হয়েছে। একই মামলায় ঠাকুরগাঁওয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে ১৪ জনকে। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে—
গাজীপুর: সিটি করপোরেশনের মেয়র জায়েদা খাতুনের বাসভবনে হামলা হয়েছে। গত শনিবার মধ্যরাতে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল যুবক এ হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে হামলাকারীরা তার বাসায় ঢুকতে পারেনি।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের (জিএমপি) গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিয়াউল হক জানান, শনিবার মধ্যরাতে সিটি করপোরেশনের হারিকেন নামক স্থানে মেয়র জায়েদা খাতুনের বাসভবনে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। তারা মেয়রের বাসভবনে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। বাসার প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। খবর পেয়ে পুলিশ মেয়রকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যায়। তবে ঘটনার পর থেকে বাসভবনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কে বা কারা এ হামলা চালিয়েছে তা জানা যায়নি।
এদিকে গতকাল সকালে গাজীপুরে কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে যুবকদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শহীদ স্মৃতি স্কুলের উত্তর পাশে সকালে পুলিশ অবস্থান নেয়। এ সময় কিছু যুবক এ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বেলা দেড়টা পর্যন্ত সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মালেকের বাড়ি, বোর্ডবাজার, গাছা ও বড়বাড়িতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
লক্ষ্মীপুর: আট দফা দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন লক্ষ্মীপুরের শিক্ষার্থীরা। গতকাল বেলা ১১টার দিকে শহরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সংলগ্ন ঝুমুরের ইলিশ চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। পরে ১২টার দিকে অবরোধ তুলে নিয়ে সরে যান শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপদ দূরত্বে দেখা যায় পুলিশকে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, কোটা সংস্কারের সঙ্গে আরো সাত দফা দাবি আছে। সরকারকে সব দাবি মেনে নিতে হবে। আমাদের আন্দোলন কোনো রাজতৈতিক আন্দোলন নয়। তবু শিক্ষার্থীদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। আমরা হত্যাকারীদের বিচার এবং নিহতদের পরিবারের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।
কারফিউর দ্বিতীয় দিন সকাল থেকেই লক্ষ্মীপুর ছিল থমথমে। সেনাসদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। পাশাপাশি ছিল পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের তৎপরতা। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। ছোট ছোট কিছু যানবাহন চলতে দেখা গেলেও বড় কোনো যানবাহন রাস্তায় বের হয়নি। জরুরি সেবা ছাড়া বন্ধ ছিল বাজার এলাকার অধিকাংশ দোকানপাট।
সদর থানার ওসি ইয়াসিন ফারুক মজুমদার বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক। কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’
সাভার : রেডিও কলোনি, সিআরপি ও নিউ মার্কেট এলাকায় কিছু লোক জড়ো হলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। এছাড়া বিকাল সাড়ে ৩টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আাদালতের রায় প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ মিছিল করেন। মিছিলটি শহীদ মিনার থেকে ক্যাম্পাসের পাশে আমবাগান, ইসলাম নগর ও গেরুয়া প্রদক্ষিণ করে ক্যাম্পাসে ফিরে আসে।
রাঙ্গামাটি: কারফিউর দ্বিতীয় দিনে স্থবির ছিল রাঙ্গামাটির জনজীবন। তবে সকাল থেকে শহরে অভ্যন্তরীণ রুটে যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যান চলাচলও কিছুটা বেড়েছিল। তবে বন্ধ রয়েছে খাবারসহ অন্য দোকানপাট। বেলা বাড়ার পর অলিগলিতে কিছু দোকানপাট খুলতে দেখা যায়। খোলা রয়েছে প্রধান সড়কের পাশের ওষুধের দোকানগুলো। সকাল থেকেই শহরের মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেন পুলিশ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে টহলে রয়েছে বিজিবি। বন্ধ রয়েছে কাপ্তাই হ্রদে লঞ্চ চলাচলও। খোলেনি সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত কিছুই। তবে রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলায় সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী: বাজারের অধিকাংশ দোকানই বন্ধ রয়েছে। এ কারণে আড়তগুলো থেকে পর্যাপ্ত সবজি রাজশাহীতে পৌঁছাতে পারেনি। যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাজারে ক্রেতার সংখ্যাও কম। মানুষ বাসার আশপাশের দোকান থেকে কেনাকাটা করছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শহরজুড়ে টহল অব্যাহত রেখেছে। জায়গায় জায়গায় লোকজনকে তল্লাশি করতে দেখা গেছে। তল্লাশির সময় কয়েকজনকে আটক করতেও দেখা গেছে।
এছাড়া বগুড়া, গোপালগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, মাগুরা, যশোর, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, কুড়িগ্রাম, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানে তেমন কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। তবে জেলা শহরে রিকশা ও অটোরিকশা চলাচল করলেও দূরপাল্লার যানবাহন ছেড়ে যায়নি। খোলা রয়েছে ওষুধ ও কাঁচাবাজার। সড়কে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল অব্যাহত হয়েছে।










