খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে বিনামূল্যের ওষুধ ও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতাল থেকে যেসব ওষুধ পাওয়ার কথা সেগুলো না পেয়ে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। তবে সরকারি এসব ওষুধ বাইরের ফার্মেসিতে মিলছে। ভুক্তভোগীরা জানান, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, সার্জারি ওয়ার্ড, এমনকি প্রসূতি বিভাগের সিজারিয়ান রোগীদের ক্ষেত্রেও সেলাইয়ের সুতা, ভায়োডিন, ব্যথানাশক ইনজেকশন, অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন উপকরণ বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়া ডায়ালাইসিস বিভাগে হেমোডায়ালাইসিস প্লুট পার্ট-এ, পার্ট-বি, ডায়ালাইজার, ক্যাথেটার, স্যালাইন, ব্লাডট্রেডিং, ইনজেকশন ও সিরিঞ্জসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীও ফার্মেসি থেকে কিনতে হচ্ছে।
অনুসন্ধানে একাধিক রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসার পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওয়ার্ডবয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী কেনার স্লিপ ধরিয়ে দেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীও কেনানো হয়। প্রসূতি বিভাগের সিজারিয়ান রোগীদের ক্ষেত্রে এ ঘটনা বেশি। এতে একটি সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও বিভিন্ন সামগ্রী বাইরে কিনতে ৮-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
জেলার বটিয়াঘাটার গাওঘরার সোহেল শেখ গত সপ্তাহে তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে ভর্তি করেন খুমেক হাসপাতালে। তিনদিন পর সিজারিয়ান অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সিজারের আগেই তাকে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর একটি প্যাকেজ কিনে আনতে স্লিপ ধরিয়ে দেয়া হয়। সোহেল বলেন, ‘এর জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে, এটা কেমন কথা?’
এ বিষয়ে হাসপাতালের গাইনি ও অবস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. জয়ন্ত কুমার দাস বলেন, ‘এমন অভিযোগের বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নেব।’
ডায়ালাইসিসের ক্ষেত্রেও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ। ভুক্তভোগীরা জানান, কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস অনেকটা অত্যাবশ্যকীয়। শয্যা সংকটে এ বিভাগে সিরিয়াল দিয়ে মাসের পার মাস অপেক্ষা করতে হয়। তবে গোপনে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে শয্যা মিললেও ডায়ালাইসিসে আবার প্রায় হাজার তিনেক টাকার চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। বাড়তি টাকায় চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে।
নগরের বানরগতি এলাকার সোমা রহমান গতকাল হাসপাতালের সামনের একটি ওষুধের দোকান থেকে ডায়ালাইসিসের চিকিৎসাসামগ্রী কিনছিলেন। তিনি জানান, হাসপাতালের ডায়ালাইসিস বিভাগে তার বাবার ডায়ালাইসিস করানো হবে। গত তিন বছর বেসরকারিভাবে ডায়ালাইসিস করাতে গিয়ে তারা প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এবারই প্রথম এখানে এসেছেন। তবে হাসপাতালে চিকিৎসাসামগ্রীর সরকারি সরবরাহ নেই বলে এগুলো বাইরে থেকে আনতে বলা হয়েছে।
কিডনি রোগীদের এসব ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালকের অনুমতি ছাড়া কোনো কথা বলতে রাজি হননি হাসপাতালের কিডনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ আর্শাদ-উল-আজীম।
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, জরুরি বিভাগ, সার্জারি ওয়ার্ড ও প্রসূতি বিভাগের সিজারিয়ান রোগীদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ এবং চিকিৎসাসামগ্রী সরকারিভাবে সরবরাহ রয়েছে। এ বিষয়ে হাসপাতালের সার্জিক্যালসামগ্রী সরবরাহ বিভাগের স্টোরকিপার শরিফুর রহমান বলেন, ‘সরকারিভাবে প্রায় ১৫০ প্রকারের চিকিৎসাসামগ্রী বিনামূল্যে রোগীদের সরবরাহ করা হচ্ছে।’ মেডিসিন স্টোরের ইনচার্জ অবনী বিশ্বাস জানান, বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ মিলিয়ে সরকারিভাবে প্রায় ১০০ প্রকার ওষুধের সরবরাহ রয়েছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী রোগীকে সেলাই দেয়ার আগে চিকিৎসকের অনুমতি নেয়ার কথা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়ার্ডবয়রা তা মানছেন না। চিকিৎসকদের না জানিয়ে কখনো কখনো বাইরে থেকে ইনজেকশন ও চিকিৎসাসামগ্রী কিনতেও বলা হচ্ছে। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
খুমেক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. আখতারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালের স্টোরে পর্যাপ্ত সেলাইয়ের সুতা, প্রয়োজনীয় ইনজেকশন, অ্যান্টিবায়োটিক রয়েছে। এগুলো রোগীদের বিনামূল্যে পাওয়ার কথা। রোগীরা কেন এসব চিকিৎসাসামগ্রী পাচ্ছেন না তা তদন্ত করে দেখা হবে। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
খুলনা নাগরিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘চিকিৎসাসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। সরকারি সেবা কেন্দ্রগুলোতে যদি ওষুধ, সেলাইয়ের সুতা, ইনজেকশন ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হয় তাহলে মানুষ সরকারি চিকিৎসাসেবার প্রতি আস্থা হারাবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্টাফ জানান, হাসপাতালের কিছু সরকারি স্টাফ ও আউটসোর্সিং কর্মচারী রোগীদের দিয়ে বাইরে থেকে ওষুধ কিনিয়ে তা হাসপাতালের সামনের ফার্মেসিতেই বাণিজ্য করেন। জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, সার্জারি ওয়ার্ড, প্রসূতি বিভাগের নরমাল ডেলিভারি ইউনিট ও ডায়ালাইসিসসহ আরো কয়েকটি বিভাগের দায়িত্বরতরা এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। তাদের দাবি, এর থেকে বড় ঘটনা ঘটছে স্টোরগুলোয়। সেখান থেকেই এসব সরকারি মালামাল বাইরে পাচার হয় বেশি। বিগত দিনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে যা কয়েক দফা ধরাও পড়েছে।
অন্যদিকে হাসপাতালের বহির্বিভাগের ফার্মেসিতে গতানুগতিক কিছু ওষুধ পাওয়া যায় বলে জানান কয়েকজন ভুক্তভোগী। তারা অভিযোগ করেন, আগে এখানে দামি ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটের কৌটাসহ অনেক ধরনের ওষুধ পাওয়া যেত। এখন তা দেয়া হয় না। নাপা, প্যারাসিটামল জাতীয় কিছু গতানুগতিক ওষুধ দেয়া হয়।
এ বিষয়ে ফার্মেসি ইনচার্জ নিহারুল ইসলাম বলেন, ‘বহির্বিভাগে সরকারিভাবে প্রায় ৪০ প্রকারের ওষুধের সরবরাহ থাকলেও চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশনে এসব ওষুধ লেখার ব্যাপারে আন্তরিক নন। এ কারণে অনেক সময় এখান থেকে অনেককে ওষুধ দেয়া হয় না।’
সহকারী পরিচালক কাজী আহসান হাবিব বলেন, ‘ডাক্তারদের প্রেসক্রিশপনে সরকারি ওষুধ লেখার ব্যাপারে কোনো অনীহা ও দুরভিসন্ধি থাকলে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’
হাসপাতালের পরিচালক মো. কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ২০২৫ সালের আগস্টে যোগদানের পর এসব সমস্যা পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা করছি।’










