নতুন পর্যটন মৌসুমে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ভ্রমণের অনুমতি দিয়েছে সরকার। সে অনুসারে, গতকাল (১ নভেম্বর) থেকে প্রবাল দ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু পর্যটকবাহী জাহাজগুলোর রুট পারমিট আবেদনে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট, নথিপত্রের ঘাটতিতে কোন জাহাজকেই চলাচলের অনুমতি দেয়নি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এতে সুযোগ থাকলেও পর্যটকদের সেন্ট মার্টিন যাত্রা বিলম্বিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত দ্বীপটিতে পর্যটক প্রবেশের সুযোগ থাকছে। দৈনিক সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক ভ্রমণ করতে পারবেন। এমনকি পুরো মৌসুমেই দ্বীপে রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্তের পরও পর্যটক পরিবহন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

কক্সবাজার-সেন্ট মার্টিন নৌপথে চলাচলে আগ্রহী সাতটি পর্যটকবাহী জাহাজের মালিকপক্ষ রুট পারমিটের আবেদন করলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়নি। ফলে তিনটি জাহাজের অনুকূলে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সম্মতিপত্র পাওয়া সত্ত্বেও রুট পারমিট ও সময়সূচি অনুমোদন করতে পারছে না বিআইডব্লিউটিএ। বাকি চারটি জাহাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নথির অভাবে মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সম্মতি চাওয়ার প্রক্রিয়াও আটকে রয়েছে। পর্যটন মৌসুম শুরুর পরও জাহাজ চলাচলের অনুমোদন নিয়ে এমন জটিলতায় দ্বীপ ভ্রমণের পরিকল্পনা করা পর্যটকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের অনুমতি রয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি। আগের নির্দেশনায় নভেম্বরে দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসা এবং ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখার কথা বলা হলেও পরবর্তী সংশোধন করা হয়। এতে ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পুরো সময়েই রাত্রিযাপনের অনুমতি নিশ্চিত করা হয়েছে। পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক। অনুমোদিত জাহাজ কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে চলাচল করবে।

বিআইডব্লিউটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক (নৌনিট্রা) সালমা আক্তার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে আজ জাহাজগুলোর আবেদনে কাগজপত্রের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। চিঠি অনুযায়ী, এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বারো আউলিয়া ও এমভি টেকনাফের মালিকপক্ষ গত ৬ ও ৭ অক্টোবর রুট পারমিট ও সময়সূচি অনুমোদনের আবেদন করে। এসব জাহাজের অনুকূলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সম্মতিপত্র পাওয়া গেলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় অনুমোদন দেয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে এমভি কেয়ারি ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন, এমভি কেয়ারি সিন্দাবাদ, এলসিটি কাজল ও এমভি বে-কুইজার-১ নামের চারটি জাহাজের মালিকপক্ষ ২৬ ও ২৭ অক্টোবর আবেদন করে। কিন্তু এসব জাহাজের প্রয়োজনীয় নথি না থাকায় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কাছে নীতিগত সম্মতি চেয়ে চিঠি পাঠানোও সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ সাতটি জাহাজের কোনোটিরই রুট পারমিট ও সময়সূচি অনুমোদনের প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি।

বিআইডব্লিউটিএর চিঠিতে সাতটি জাহাজের মালিকপক্ষকে হালনাগাদ সার্ভে সার্টিফিকেট, রুট পারমিট ফি জমার প্রমাণ, কোস্টগার্ডের ছাড়পত্র, ভয়েজ লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দেয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এসব নথি পাওয়ার পরই পরবর্তী অনুমোদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

এদিকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের সময়সীমা, দৈনিক পর্যটক সংখ্যা ও জাহাজ ছাড়ার স্থান নিয়ে গত ১২ অক্টোবর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা বিবেচনায় নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে ২৫ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বর্তমান সময়সীমায় পর্যটক যাতায়াতের অনুমতি দেয়া হয়। রাত্রিযাপনের সময়সীমা নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করতে ২৭ অক্টোবর সংশোধিত নির্দেশনাও জারি করা হয়। তবে দ্বীপে পর্যটক পরিবহনের জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদনও বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটকদের জন্য দ্বীপ উন্মুক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলেও জাহাজগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে তার প্রভাব পড়বে পর্যটন কার্যক্রমে। বিশেষ করে মৌসুমের শুরুতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে দ্বীপের পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় মানুষের আয়ের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

বিআইডব্লিউটিএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত আসা-যাওয়ায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার সামুদ্রিক নৌ পথ। কোন জাহাজের সার্ভে সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় নৌ সংক্রান্ত কাগজপত্র না থাকলে রুট পারমিট দেয়ার কোন সুযোগ নেই। বেশির ভাগ জাহাজ দীর্ঘদিন সমুদ্রে চলাচল না করায় এসব সনদ নিরাপদ নৌযাত্রার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও জাহাজ মালিকরা সেগুলো জমা দেয়নি। যার কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে মৌসুম শুরু হলেও সেন্ট মার্টিনে পর্যটক নিয়ে জাহাজ যাত্রা বিলম্ব হচ্ছে। যে প্রতিষ্ঠান দ্রুত সময়ের মধ্যে চাহিদামত কাগজপত্র জমা দিবে তাদের দ্রুত রুট পারমিটের ব্যবস্থা করা হবে।

যদিও জাহাজ মালিক ও ট্যুর অপারেটররা বলছেন, ২৭ অক্টোবর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে ১ তারিখ থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় জাহাজের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হালনাগাদ করা সম্ভব হয়নি। বিআইডব্লিউটিএর নির্দেশনা মোতাবেক নথিপত্র দ্রুত জমা দিতে সবগুলো প্রতিষ্ঠানই চেষ্টা করছে। আগামী শুক্রবারের মধ্যে সেন্ট মার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ নিয়ে যেতে ট্যুর অপারেটরদের মধ্যে অলিখিত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।