ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনার রেশ এসে পড়েছে দেশের পণ্যবাজারেও। দুই সপ্তাহ ধরে অস্থির ছিল ভোগ্যপণ্যের বাজার। গতকাল বাংলাদেশ সময় ভোরে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে বেসামাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার। সকাল থেকেই প্রধান প্রধান ভোগ্যপণ্যের পাইকারি দাম মণপ্রতি ১০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে আমাদের দেশের ভোগ্যপণ্য আমদানিতে তেমন একটা সংযোগ নেই। তার পরও এ মূল্যবৃদ্ধি মূলত হুজুগ থেকে।

গতকাল সকাল থেকে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) সয়াবিনের দাম প্রায় ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ৭ হাজার টাকায় লেনদেন হয়েছে। একইভাবে পাম অয়েলের দাম বেড়ে হয়েছে মণপ্রতি ৬ হাজার টাকা ও সুপার পাম অয়েল ৬ হাজার ৩০০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের ভোজ্যতেলের মণপ্রতি এ দামের পার্থক্য ৭০০-৮০০ টাকা। কেজির হিসাবে এ সময়ের মধ্যে দাম বেড়েছে ২০ টাকারও বেশি। ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিক হলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। এ বাজারের বিভিন্ন আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোজ্যতেল ছাড়াও গম, চিনির দামও কয়েক দিনের তুলনায় গতকাল বেড়েছে মণপ্রতি ৮০-১০০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পূর্ব ইউরোপে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়েছে, পাশাপাশি ভোগ্যপণ্যের বুকিংও বেড়েছে। এছাড়া পরিস্থিতির কারণে খাদ্য সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) বিপণনকারী ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অগ্রিম ক্রয়ে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেড়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গেছে ভোগ্যপণ্যের দাম। পাইকারি বাজারের এ প্রভাব ধীরে ধীরে খুচরা পর্যায়েও ছড়িয়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পরিপ্র্রেক্ষিতে গতকাল জ্বালানি তেল, স্বর্ণসহ বেশকিছু পণ্যের বুকিং দর বাড়তে থাকে। এর মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে, যার কারণে দেশীয় ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান ও ব্রোকাররা নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে দুপুরের মধ্যেই ভোজ্যতেলের দাম একদিনের হিসাবে রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যায়। দিনশেষে সন্ধ্যায় খাতুনগঞ্জে ভোজ্যতেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় স্থির রয়েছে।

বুধবার সয়াবিন তেল মণপ্রতি ৬ হাজার ৭০০ টাকায় লেনদেন হয়েছিল, গতকাল দিনশেষে তা ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া বুধবার পাম অয়েল লেনদেন হয়েছিল ৫ হাজার ৪০০ ও সুপার পাম অয়েল ৬ হাজার টাকায়। গতকাল তা বেড়ে হয়েছে যথাক্রমে ৬ হাজার ও ৬ হাজার ৩০০ টাকা। এছাড়া গমের দাম দুদিনের ব্যবধানে মণপ্রতি বেড়েছে ৫০ টাকা, চিনির দাম কয়েক দিনের ব্যবধানে বেড়ে লেনদেন হয়েছে মণপ্রতি ২ হাজার ৮০০ টাকায়। এছাড়া চালসহ অন্যান্য

অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যের দামও গতকাল বাড়তি অবস্থায় ছিল।

মূল্যবৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে, যার কারণে ভোগ্যপণ্যের দাম তেমন একটা না বাড়লেও শিপিং খরচ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ৭০-৮০ ভাগ বিশ্ববাজারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় দেশের বাজারে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। আসন্ন রমজান ও গ্রীষ্মকালীন মৌসুমের কারণে আগামীতে চাহিদা বাড়লে বুকিং দরের ঊর্ধ্বমুখিতায় দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়বে, যার কারণে এখন থেকেই ব্যবসায়ীরা পণ্য মজুদের পরিকল্পনা শুরু করেছেন।

এ বিষয়ে দেশের অন্যতম ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান টিকে গ্রুপের জ্যেষ্ঠ পরিচালক মোহাম্মদ তারিক আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, এ যুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানীকৃত ভোগ্যপণ্যের সরাসরি কোনো সংযোগ নেই। কিন্তু বিশ্ববাণিজ্যের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, শিপিং চার্জ বেড়ে যাওয়া, বিশ্বের অন্যান্য দেশের চাহিদা বৃদ্ধি কিংবা সংকট স্বভাবতই বিভিন্ন দেশে প্রভাব ফেলে। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর কোনো দেশই ভোজ্যতেলের বুকিং দর প্রস্তাব করছে না। মূলত সরবরাহ সংকট কিংবা সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তায় বুকিং দিতে ব্যর্থ হচ্ছে সরবরাহকারীরা।

ভোজ্যতেল বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে নিয়ন্ত্রক পণ্য হিসেবে কাজ করে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারকরা। তারা বলছেন, এটির মূল্যবৃদ্ধি বা কমে যাওয়া অন্য পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলে। ভোজ্যতেল আমদানিতে কোনো শুল্ক না থাকলেও ভ্যাট দিতে হয়। বর্তমানে পাম অয়েল আমদানিতে ১৬ শতাংশ ও সয়াবিন আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়, যার কারণে বৈশ্বিক দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার পরিপ্র্রেক্ষিতে ভ্যাটের কারণেও দেশের বাজারে এর প্রভাব পড়ছে বেশি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত অনেক আগেই ভোজ্যতেল আমদানিতে শুল্ক তিন-চতুর্থাংশ কমিয়েছে। রমজান সামনে রেখে সরকার ভোজ্যতেল আমদানিতে ভ্যাট স্থগিত কিংবা না কমালে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বর্তমান পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের যে দাম, সেটি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি। সর্বশেষ ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়। এর আগে ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৬০ ও খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৩৬ টাকা নির্ধারিত হয়েছিল। এছাড়া বোতলজাত সয়াবিনের পাঁচ লিটারের দাম ৭৬০ ও পাম অয়েলের দাম ছিল প্রতি লিটার ১১৮ টাকা। সর্বশেষ দর অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ৮ টাকা বেড়ে ১৬৮ এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৭ টাকা বেড়ে ১৪৩, বোতলজাত সয়াবিনের পাঁচ লিটারের দাম ৩৫ টাকা বেড়ে ৭৯৫ ও পাম অয়েলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বেড়ে ১৩৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সর্বশেষ বৈঠকে ব্যবসায়ীরা ভোজ্যতেলের দাম শিগগিরই নতুন করে বাড়ানোর আভাস দিয়েছিলেন।

খাতুনগঞ্জের একাধিক পাইকারি ব্যবসায়ী বলছেন, মহামারী পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসার পর পরই বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ভোগ্যপণ্যের বাজারকে সংকটে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি ও গমে ৮০-৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর হওয়ায় এ প্রেক্ষাপটে দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক। আসন্ন রমজান ও গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের শুল্ক কাঠামোয় ছাড় দেয়া ছাড়া ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আর কোনো সুযোগ নেই বলেও মনে করছেন তারা।

বিশ্বের প্রায় ২৮ শতাংশ গমের জোগানদাতা রাশিয়া ও ইউক্রেন। ওই অঞ্চলে ডালজাতীয় খাদ্যশস্যও উৎপাদন হয়। এছাড়া রাশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল রফতানিকারক দেশ। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করতে শুরু করেছে। এছাড়া জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ রাখার সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্য ও পণ্যের দামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।