রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থছাড় নিয়ে এক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্যই এ অর্থ ব্যবহার করা যাবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্র পরীক্ষা সাপেক্ষে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাবের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীকে এ অর্থ দেয়া হবে। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন পোশাক মালিকরা।
এ বিষয়ে পোশাক মালিকদের বক্তব্য হলো, সব শ্রমিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা এমএফএস হিসাব নেই। এমনকি সবার জাতীয় পরিচয়পত্রও নেই। ফলে প্রজ্ঞাপনটি যথাযথভাবে পরিপালনের প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয়ে ভুগছেন তারা।
প্রধানমন্ত্রীর ২৬ মার্চ ঘোষিত এ প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থছাড় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে ২ এপ্রিল এ প্রজ্ঞাপন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সহজ শর্তে ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা হিসেবে প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ পাবে। উৎপাদনের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ পণ্য রফতানি করছে এমন সচল প্রতিষ্ঠান এ তহবিল থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাবে। তবে ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ নিতে হবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তহবিল থেকে কেবল শ্রমিক-কর্মচারীদের সর্বোচ্চ তিন মাসের বেতন বা ভাতা পরিশোধের জন্য ঋণ/বিনিয়োগ সুবিধা দেয়া হবে। গ্রাহকের অনুকূলে সৃষ্ট ঋণ/বিনিয়োগ দিয়ে তফসিলি ব্যাংকগুলো সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীর ব্যাংক হিসাবে সরাসরি অর্থ প্রদান করবে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক শ্রমিক-কর্মচারীর জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যাংকগুলো বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করে পরীক্ষা করবে। কোনো প্রকার নগদ লেনদেন করা যাবে না এবং শ্রমিক-কর্মচারীর ব্যাংক বা এমএফএস হিসাব ছাড়া অন্য কোনোভাবে লেনদেন করা যাবে না। ঋণগ্রহীতাদের এ পদ্ধতি অনুসরণে অঙ্গীকারও দিতে হবে।
অনুদান আশা করলেও সরকার ঋণ হিসেবে এ প্রণোদনার অর্থ দেয়ার ঘোষণা দেয়ায় মালিকরা আশাহত হয়েছেন। কিন্তু তা মেনে নিলেও শিল্প মালিকরা বলছেন, তাদের মূল আপত্তির ক্ষেত্রটি হলো শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেয়ার বা বিতরণ প্রক্রিয়া নিয়ে। প্রজ্ঞাপনে যে বিতরণ প্রক্রিয়া বলা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ বেশির ভাগ শ্রমিকেরই ব্যাংক হিসাব বা এমএফএস হিসাব নেই। আবার অনেক শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্রও নেই।
তাদের ভাষ্যমতে, তহবিলের অর্থ শ্রমিক পর্যন্ত পৌঁছানোর যে পদ্ধতি অনুসরণের কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। তাই প্রজ্ঞাপনে যে বিতরণ পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, তা অনুসরণ করে সব শ্রমিকের বেতন-ভাতা পরিশোধ করাও সম্ভব হবে না। কারণ পোশাক শ্রমিকের সংখ্যা ৪৫ লাখ বিবেচনায় নিলে এদের অধিকাংশেরই ব্যাংক হিসাব নেই। বিকাশ বা অন্যান্য মোবাইল ফোন সার্ভিস হিসাব থাকলেও তা আছে আনুমানিক ১০-১২ শতাংশ শ্রমিকের। আবার অনেক শ্রমিকের জাতীয় পরিচয়পত্রও নেই। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুসরণ করা একরকম অসম্ভব।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এক পোশাক শিল্প মালিক বলেন, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। বাস্তবতার কারণেই প্রজ্ঞাপন পরিবর্তন করতে হবে। বেশির ভাগ শ্রমিকের ব্যাংক হিসাব বা বিকাশের মতো এমএফএস হিসাব নেই। ফলে এ টাকা বিতরণ শুরু হলে শ্রমিকরাও বলবে, সরকার টাকা দিয়েছে, কিন্তু আমরা কেন পেলাম না। প্যাকেজের অর্থ বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে, কোনো নগদ অর্থের লেনদেন হবে না। জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের জনসংখ্যার শতভাগের জাতীয় পরিচয়পত্র এখনো সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও তা শতভাগ নিশ্চিত হয়নি। এছাড়া ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে কোনোভাবেই শ্রমিকের তিন মাসের বেতন পরিশোধ সম্ভব হবে না। কারণ শুধু পোশাক খাতের সব শ্রমিককে বিবেচনায় নিলে তাদের এক মাসের বেতন দাঁড়ায় ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
এ বিষয়ে বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, প্রতি মাসে শ্রমিকদের যে বেতন মালিক পক্ষ দেয়, তার অধিকাংশই নগদে। আমরা আলোচনা করছি, আগামী রবি বা সোমবার বিজিএমইএ-বিকেএমইএ যৌথভাবে আবেদন করব বিতরণ প্রক্রিয়া পরিবর্তনের জন্য। আশা করছি পরিবর্তন হবে। কারণ বিতরণ প্রক্রিয়াটি বাস্তবসম্মত না হওয়ায় সব শ্রমিকদের হাতে টাকা পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
মোহাম্মদ হাতেম আরো বলেন, অর্থমন্ত্রী বরাবর আমরা যে আবেদন করব বা চিঠি দেব, সেখানে মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে। প্রথম বিষয়টি সার্ভিস চার্জ নিয়ে। ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ থেকে অব্যাহতি চাইব। দ্বিতীয়টি হলো শ্রমিকের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বেতন-ভাতা দেয়ার বিষয়টি, কারণ এটি বাস্তবসম্মত নয়। তৃতীয়টি হলো ছয় মাস পর থেকে ঋণের অর্থ পরিশোধ করার বিষয়টি। কারণ ছয় মাসের মধ্যে ঋণের অর্থ ফেরত দেয়ার অবস্থা পোশাক খাতের হবে, এমন কোনো আশা এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আগামী এক বছরের আগে রফতানি বাজার ঘুরে দাঁড়ানোরও কোনো আশা আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
অন্যদিকে শ্রমিকের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি বেতন-ভাতা পরিশোধের উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়েছেন বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, প্রজ্ঞাপন নিয়ে কোনো আপত্তি না থাকলেও এটির বাস্তবায়ন নিয়ে আমি চিন্তিত। সরকার চাইলে বেতন-ভাতা বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করা অবশ্যই সম্ভব, আমরা সেই চেষ্টাই করছি। এরই মধ্যে কতজন শ্রমিকের মোবাইল ফোন সার্ভিস হিসাব এবং কত শ্রমিকের ব্যাংক হিসাব আছে তা নিয়ে জরিপের কাজও শুরু করেছি।









