বাংলাদেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে ৪২ লাখ মামলা বিচারাধীন আছে। বিচারক প্রতি মামলার সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৮৮৩টি। এতে আদালতে সালিশ বা আপসযোগ্য বিরোধ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হওয়ায় বিচারপ্রার্থীদের আর্থিক ক্ষতি, হয়রানি ও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় দাবি করে পৌরসভার নাগরিকদের সমস্যা সহজে সমাধানের লক্ষ্যে বিরোধ মীমাংসা (পৌর এলাকা) বোর্ড আইন-২০০৪ সংস্কারের দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। আইনের আওতায় বিচারিক ক্ষমতা ২৫ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকায় সীমাবদ্ধ করাসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছেন তারা।

বুধবার (২৯ মে) রাজধানীর ব্রাক ইন সেন্টারে ‘বিরোধ মীমাংসা (পৌর এলাকা) বোর্ড আইন, ২০০৪ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব দাবি জানানো হয়। মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ পৌরসভা সমিতির যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সভাটি আয়োজনে সহায়তা করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ ও এশিয়া ফাউন্ডেশন।

আলোচনা সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, বহুমুখী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উন্নয়ন কাজ করা হচ্ছে। কোনো আইন স্মার্টলি করলে তিন মাস সময় লাগে। আলোচনা, পর্যালোচনা করে একটা সারসংক্ষেপ তুলে ধরলে বিরোধ মীমাংসা (পৌর এলাকা) বোর্ড আইন সংশোধন নিয়ে কাজ করা সহজ হবে। আমরা চাই জনবান্ধন আইনের মাধ্যমে মানুষের আইনি সেবা পাওয়া সহজ হোক।

মন্ত্রী বলেন, আমরা প্রায় ৪৩ হাজার জনপ্রতিনিধিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আরো দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আমাদের (সরকারের) কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও সরকার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। স্বাধীনতার স্বপ্ন, জাতির জনকের স্বপ্ন ও এ দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের মাঝে যদি এসব ভুলভ্রান্তি বা দুর্বলতা না থাকত, তাহলে হয়তো আরো দ্রুত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারতাম। তবে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার যে প্রতিশ্রুতি, তা থেকে আমরা বিচ্যুত হইনি।

সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন এসডিজি বাস্তবায়ন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম চেতনা হলো নাগরিকদের আইনের শাসন ও বিচার পাওয়ার অধিকার। এটি শুধু সুপ্রিম কোর্টের পর্যায় থেকে নয়, তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া ও সব মানুষের জীবন সহজ করার ক্ষেত্রে এটা (আইন সংস্কার) অবদান রাখবে। এটিকে (বিচার পাওয়ার অধিকার) আমরা ৭১ এর চেতনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছি।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশে মোট ৩২৯টি পৌরসভায় প্রায় ৫ কোটি জনগণ বসবাস করে। ২০১৮ সালে জাস্টিস অডিটের সমীক্ষা অনুযায়ী দেশের মাত্র ৯ শতাংশ লোক আদালত, ৪ শতাংশ লোক পুলিশের মাধ্যমে এবং ৮৭ শতাংশ লোক স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তির সহায়তায় বিরোধ নিষ্পত্তিতে আগ্রহী। তবে বিরোধ মীমাংসা আইনের আর্থিক এখতিয়ারসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকায় পৌরবাসী এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেজন্য দ্রুত আইনটির সংস্কার জরুরি।

সভায় বিভিন্ন পৌরসভার মেয়র সালিশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আইনের সীমাব্ধতার বিষয়ে নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

আলোচনা সভায় বিরোধ মীমাংসা বোর্ড আইন সংস্কারে আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আরো কিছু সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রায় বাস্তবায়ন পদ্ধতি সহজতর করা, আইনটির শিরোনাম পরিবর্তন করে ‘‌পৌর আদালত’ করা, মেয়রের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আপত্তি উপস্থাপন বা মেয়রের অনুপস্থিতিতে কে বোর্ডের দায়িত্ব পালন করবেন তা স্পষ্ট করা, অতি শিগগির বিধিমালা প্রণয়ন করা, ফর্ম, ফরম্যাট রেজিস্ট্রার ইত্যাদির নমুনা সরবরাহ করা ও পৌরবোর্ড কার্যক্রমে সহায়তার জন্য সিটি পুলিশের বিধান রাখা।

সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান সমন্বয়ক খান মোহাম্মদ শহীদ, দ্য এশিয়ান ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ, বাংলাদেশ পৌরসভা সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মাদারীপুর পৌরসভার মেয়র খালিদ হোসেন ইয়াদ, পঞ্চগড় পৌরসভার মেয়র জাকিয়া খাতুন, লাকসাম পৌরসভার মেয়র মো. আবুল খায়েরসহ দেশের বিভিন্ন পৌরসভা থেকে আসা জনপ্রতিনিধি ও আইনজীবী প্রমুখ।