দেশে বিরাজমান ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিতে ভাতাসহ দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য থাকা নানান সামাজিক সুরক্ষা মোটেও যথেষ্ট নয় বলে বাজেট পূর্ববর্তী এক আলোচনায় উঠে এসেছে। বক্তারা দাবি করেছেন, বাজেট আসে বাজেট যায়, কিন্তু বাজেটের মৌলিক কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন হয় না। জন-বাজেট সংসদের এ আলোচনায় অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা তাদের মতামত, চাহিদা এবং নানান দাবি-দাওয়া তুলে ধরেছেন। তারা আলোচনায় করমুক্ত আয়সীমা ন্যূনতম ৬ লাখ টাকা, অতিদরিদ্রদের জন্য দৈনিক ৫০০ টাকা হারে বছরে ন্যূনতম ১০০ দিনের কাজ নিশ্চিত করারও জোর দাবি জানিয়েছেন।

উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, দিনাজপুরে পচনশীল ফসলের জন্য হিমাগার নির্মাণ, অটোরাইস মিলে বড় সমস্যা বয়লার পরিদর্শন কর্মকর্তা বৃদ্ধি এবং সুনামগঞ্জে হাওর এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাবও আসে।  

বক্তারা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের সব মানুষের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তন, ন্যাশনাল ডেটাবেইজ বানানোর কথাও বলেন। সরকার সবাইকে পেনশনে আনার যে লক্ষ্যমাত্রার কথা বলেছেন, তাকে সত্যিকার অর্থে সর্বজনীন করতে হলে নিম্ন আয়ের যাদের প্রিমিয়াম দেয়ার সামর্থ্য নেই তাদের হয়ে সরকারই যেন তা দিয়ে দেয় সে দাবিও এদিনের প্রথম অধিবেশনে উঠে এসেছে।

বুধবার (২৯ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অক্সফাম ও গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ জনবাজেট সংসদে মোট দুটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সহ-আয়োজক হিসেবে ছিল সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস), পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যাকশন অ্যান্ড নেটওয়ার্ক (প্রাণ) ও দ্য আর্থ।

প্রথম অধিবেশনের শিরোনাম ছিল- মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক চাপ মোকাবেলায় জন-প্রস্তাবনা। এ অধিবেশনে অতিথি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, বাজেট আসে বাজেট যায়, কিন্তু বাজেটের মৌলিক কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন হয় না। গত দুই-তিন বছর ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য ১২ শতাংশ হারে বাড়ছে, তার মানে যারা নিত্যপ্রয়োজীয় পণ্য কেনেন তাদের আয় ২০-২৪ শতাংশ হারে কমে গেছে। তাহলে আমাদের বাজেটে আমরা সবাই কমবেশি হিমশিম খাচ্ছি।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদদের মিলিত দুর্নীতিতে অর্থ ও সম্পদ কেবল কেন্দ্রীভূতই হচ্ছে না, নির্বিচারে পাচারও হচ্ছে। অর্থ পাচার বন্ধ করা সম্ভব হলে, তা দিয়ে সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে সাধারণ মানুষের যেসব দাবি আছে তার অনেকগুলোই পূরণ করা সম্ভব হতো। আমাদের ধনীরা যদি ডলার দেশে রাখত, তাহলে রিজার্ভ সংকট হতো না। এদেরকে তো প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। এত দিন খবর হয়নি। এবার সরকার হাড়ে হাড়ে টের পাবে।

জাতীয় পার্টির নেতা সাবেক সংসদ সদস্য ড. শামিম হায়দার পাটওয়ারী বলেন, বাজেট ব্যবস্থাপনা আমলা ও ব্যবসায়ীমুখী না করে জনস্বার্থমূলক করা দরকার। বাজেট প্রণয়নে স্থানীয় সরকার ও প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ঘাটতি, জুডিশিয়ারিতে বাজেটের অভাব, মাইগ্রেশন ও স্কিল ডেভেলপমেন্টে বরাদ্দ না থাকা নিয়েও হতাশা ফুটে ওঠে তার কণ্ঠে। ভুল জ্বালানি নীতির কারণে দেশের অর্থনীতি ভয়াবহ চাপে পড়েছে বলেও মত দেন তিনি।

তিনি বলেন, ভর্তুকি হিসেবে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ যে পরিমাণ অর্থ আমরা দিই, তা দিয়ে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে এখনকার তুলনায় বেশি সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল। সরকারের এখন ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধের পরিস্থিতিও নেই। এখন আগের নেয়া ঋণের সুদ পরিশোধ করা হচ্ছে। বাজেটের বিষয়ে কখনো এমপিদের কাছে জানতে চাওয়া হয় না বলে তার অভিযোগ। তিনটি বাদে বাকি সংসদীয় কমিটিগুলো কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিগত দুর্বলতার কারণে বৈষম্য কমছে না, সম্পদের সুষম বণ্টন হচ্ছে না। রাজস্ব আদায় না হওয়ার মূল কারণ করফাঁকি। কোটি টাকা আয় করা লোকও করজালের বাইরে। সম্পদ কর আরোপ করার সময় এসেছে।

মূল প্রবন্ধে মো. শহীদুল্লাহ আসন্ন বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা ভাতা দ্বিগুণ করা এবং পেনশন ও সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেন। আর একশন এইডের প্রতিনিধি মৌসুমি বিশ্বাস জেন্ডার বাজেটের প্রক্রিয়াগত সংস্কার ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি তৈরির প্রস্তাবনা রাখেন।

প্রথম অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন অক্সফাম বাংলাদেশের প্রোগ্রাম কো অর্ডিনেটর ইঞ্জিনিয়ার দেবরাজ দে। তিনি অংশগ্রহণমূলক বাজেটের প্রয়োজনীয়তা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিতে তার সংস্থার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। সঞ্চালক ছিলেন গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের (ডিবিএম) নির্বাহী কমিটির সদস্য জাকিয়া শিশির এবং ডিবিএমের সহ-সভাপতি এ আর আমান। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ডিবিএমের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার মোস্তফা।

দ্বিতীয় অধিবেশনের শিরোনাম ছিল- ‘সবুজ অর্থনীতি ও যুব লভ্যাংশে বিনিয়োগ’ (ইনভেস্টিং ইন গ্রিন ইকোনমি, জাস্ট ট্রানজেশন অ্যান্ড ইয়ুথ ডিভিডেন্ড)। এ অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চেইঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান, অক্সফাম বাংলাদেশের রুবাইয়া নাসরিন সেঁজুতি এবং দ্য আর্থের মোসলেহ উদ্দিন সূচক।

প্রবন্ধে বক্তারা বলেন, সবুজ অর্থনীতি বা গ্রিন ইকোনমির চালিকাশক্তি হচ্ছে কর্মসংস্থানকে গ্রিন বা সবুজ করা। সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে অর্থনীতি পরনির্ভরশীল থাকবে। এ ধারণা সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করতে হবে এবং তাদেরকে সম্পৃক্ত করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ বন্ধ করে পরিচ্ছন্ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ খাতে আগ্রহী বেসরকারি বিনিয়োগে প্রণোদনা নিশ্চিত করা।

জাকির হোসেন বলেন, অর্থনীতি সবুজ করতে হলে প্রতিটি খাতকে সবুজ হতে হবে। সব খাত থেকে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে। এজন্য নীতিগত পরিবর্তন যেমন লাগবে তেমনি বাজেটে সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে।

সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ জন-বাজেট সংসদে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা ও জেলার প্রায় আড়াইশ প্রতিনিধি অংশ নেন। তারা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসন প্রকল্প, কৃষকের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিতে কাঠামো সংস্কার, শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ, কর্মজীবী প্রসূতি মাদের জন্য বিশেষ ভাতা, কমিউনিটি ডে কেয়ার, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা বৃদ্ধি, কারিগরী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, দলিত সম্প্রদায়ের উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য সুপেয় পানিতে বরাদ্দসহ নানান দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন।