কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় আড়াই শতাধিক চর রয়েছে। নাগেশ্বরী উপজেলার নুনখাওয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা ব্রহ্মপুত্রের এসব চরে প্রায় দুই হাজার পরিবার বাস করছে। জেলার অন্যান্য নদ-নদীর ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও ঝুঁকিতে থেকে যাচ্ছে এসব পরিবার। প্রতি বছরই নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারাচ্ছে বিচ্ছিন্ন এসব চরের বাসিন্দারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নদ-নদীর তীর সংরক্ষণে সরকারি প্রকল্প চলমান। কিন্তু নদীর মাঝে যেসব চর রয়েছে সেগুলো রক্ষায় প্রকল্প না থাকায় ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
চরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, কুড়িগ্রামের নয়টি উপজেলায় ১৬টি নদ-নদীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভাঙনপ্রবণ ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও গঙ্গাধর নদীর তীর। এসব নদ-নদীর ভাঙন দুই পাড় ও চরাঞ্চলের মানুষের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও স্থাপনা। পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে। যদিও দুই-এক বছরের ব্যবধানে তা আবারো বিলীন হয়ে যায় নদীগর্ভে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার প্রধান পাঁচটি নদ-নদীর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র নদে চিলমারী ও উলিপুর উপজেলায় ডান তীরে ৪.৮০০ কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী ভাঙন রোধে প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এছাড়া রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় বামতীরে প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে ৮.৩০০ কিলোমিটার, যা ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। এর আগে ২০০৭-১৭ সাল পর্যন্ত চিলমারী ও উলিপুর উপজেলায় ব্রহ্মপুত্রের ডানতীরে স্থায়ী ভাঙন রোধে কাজ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে নয় কিলোমিটার এবং রৌমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্রের বামতীরে কাজ করা হয়েছে প্রায় দুই কিলোমিটার।
অর্থাৎ ব্রহ্মপুত্রের ৮০ কিলোমিটার পাড়ের মধ্যে নদের পাড় সুরক্ষা করা হচ্ছে মাত্র প্রায় ২৪ কিলোমিটার। বাকি ৫৬ কিলোমিটার পাড় অরক্ষিত অবস্থায় ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ৮০ কিলোমিটার পাড়ের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রে জেগে ওঠা আড়াই শতাধিক চর রক্ষায় সরকারি কোনো প্রকল্প না থাকায় ঝুঁকিতে বাস করছেন চরের বাসিন্দারা।
অন্যদিকে ধরলা নদীর দুই পাড়ের দৈর্ঘ্য ১০০ কিলোমিটার হলেও তীর সংরক্ষণ কাজ চলমান রয়েছে মাত্র ১৬ দশমিক ৮৪০ কিলোমিটারের। গত বছরের জুনে কাজটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো চলমান। এছাড়া দুধকুমার নদী ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১০০ কিলোমিটারের ২৫ দশমিক ৫৮০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ কাজ চলমান রয়েছে, যা ২০২৫ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে ৪২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে তিস্তা নদীতে স্থায়ী ভাঙন রোধে সরকারি কোনো প্রকল্প না থাকায় রাজারহাট, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলায় দুই পাড়ের ৮৪ কিলোমিটার রয়েছে ভাঙন ঝুঁকিতে। আর ভাঙনপ্রবণ ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের গঙ্গাধরে স্থায়ী ভাঙন রোধে কোনো প্রকল্পই নেয়া হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও গঙ্গাধর নদীর মাঝে কোনো চর নেই। নাগেশ্বরী উপজেলার নুনখাওয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা ব্রহ্মপুত্র নদ বিভিন্ন চ্যানেলে কুড়িগ্রাম সদর, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর মাঝে জেগে ওঠা দ্বীপচরে যুগের পর যুগ মানুষ বাস করে আসছে।
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মুসার চরের বাসিন্দা মতিয়ার রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছর বন্যায় পাশের চরটি পুরোপুরি বিলীন হওয়ায় তারা ৫০টি পরিবার নতুন জেগে ওঠা চরে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে। নতুন চরের নাম দিয়েছেন মুসার চর। তবে এখান থেকে সরাসরি সড়ক পথে যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা নেই। যেদিকেই যেতে হচ্ছে নৌকায় ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়েই যেতে হচ্ছে।’
একই চিত্র উলিপুর, সদর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় অবস্থিত প্রায় আড়াই শতাধিক ছোট-বড় চরের।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্রের অসংখ্য চর রয়েছে, যেগুলো মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রতিটি চরে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ৪০-১০০ পর্যন্ত। নদীর বুকে থাকায় এসব চর ৩-১২ বছরের ব্যবধানে ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত তীরে ভাঙন রোধে কাজ করলেও এসব চরে কোনো কাজ করে না। ফলে কয়েক বছরের ব্যবধানে এসব চর বিলীন হয়ে যাচ্ছে।’
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নদ-নদীর তীর সংরক্ষণে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমারে প্রকল্প চলমান। কিন্তু নদীর মাঝে যে চর রয়েছে, সেগুলো রক্ষায় সরকারি কোনো প্রকল্প নেই। এজন্য চরের ভাঙন রোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।’










