অন্যদিকে ঢাকার কমলাপুর স্টেশন থেকে গতকাল বেশির ভাগ ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে গেছে। ঢাকা ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি ট্রেনে ছিল যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। নৌপথেও বেড়েছে মানুষের চাপ। গতকাল সারা দিনে ঢাকার সদরঘাট থেকে ৭০টির বেশি লঞ্চ ছেড়ে গেছে, যেগুলো ছিল যাত্রীতে পূর্ণ। ঈদ উপলক্ষে যাত্রীর চাপ বেড়েছে আকাশপথেও। যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের ঈদে দীর্ঘ ছুটি হওয়ায় মানুষ ধাপে ধাপে ঢাকা ছাড়ছে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগে ছুটি হয়ে যাওয়া এবং পুলিশ ও প্রশাসনের তৎপরতায় এবারের ঈদযাত্রা এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
ঈদ উপলক্ষে মানুষের ঘরে ফেরার এ সময়ে এখন পর্যন্ত কোথাও যানজট হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গতকাল বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় গোমা সেতুর উদ্বোধন শেষে মন্ত্রী বলেন, ‘ঈদকে ঘিরে দুই থেকে তিনদিনের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন। তাদের যাত্রা স্বস্তিদায়ক করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে আমরা যে উদ্যোগ নিয়েছি, তাতে যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ও আরামদায়কের মাধ্যমে স্বজনদের কাছে যাবে।’
অতীতে ঈদযাত্রায় দীর্ঘ যানজট দেখা যেত ঢাকা-যমুনা সেতু মহাসড়কে। যদিও এবারের ঈদযাত্রা এখন পর্যন্ত স্বস্তিদায়ক বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। গতকাল সকাল থেকে কড্ডার মোড়, নকলা ও হাটিকুমরুলসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে যানবাহনের ব্যাপক চাপ থাকলেও কোথাও কোনো যানজট বা স্থবিরতা দেখা যায়নি। বাস, ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়িগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাচল করায় ঘরমুখো মানুষ ভোগান্তি ছাড়াই নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে।
ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চলের ২২ জেলায় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম যমুনা সেতু। প্রতি বছর এখানে তীব্র যানজট সৃষ্টি হলেও এবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানান, যানবাহনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়লেও সেতুর দুই প্রান্তে যাতায়াত স্বাভাবিক রাখতে তারা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে বিশেষ টিম।
অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বর্তমানে যানজট না থাকলেও ঘরমুখো মানুষের চাপে পরিবহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল বাহার মজুমদার জানান, ঈদযাত্রাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে সাধারণ মানুষের যাতায়াত আনন্দদায়ক ও নির্বিঘ্ন করতে দিন-রাত মহাসড়কে সজাগ অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।
দক্ষিণাঞ্চলের পথে পদ্মা সেতু দিয়ে গতকাল ভোর থেকে যানবাহনের চাপ বাড়লেও টোল প্লাজা এলাকায় যাত্রীদের কোনো ভোগান্তি হচ্ছে না। মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তের টোল দ্রুত পরিশোধ করে চালকরা স্বাভাবিক গতিতেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন, কোথাও যানজটের খবর পাওয়া যায়নি।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট ফেরিঘাটে গতকাল যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বাড়লেও যাতায়াত চিত্র ছিল বেশ স্বস্তিদায়ক। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যানজট না থাকায় এবং ছোট যানবাহনগুলো বিকল্প সড়ক ব্যবহার করায় যাত্রীরা ভোগান্তি ছাড়াই ঘাট পার হতে পারছেন।
ঈদে যাতায়াতে বরাবরই ঘরমুখো মানুষের পছন্দের শীর্ষে থাকে রেল। যদিও অতীতে শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে ঈদযাত্রায় মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে দেখা গেছে। শিডিউল বিপর্যয় ছাড়াও অতিরিক্ত ভিড়ের কারণেও দুর্ভোগে পড়তেন রেলের যাত্রীরা। এবার এখন পর্যন্ত শিডিউল বিপর্যয় দেখা না গেলেও গতকাল থেকে প্রায় প্রতিটি ট্রেনে যাত্রীদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ করা গেছে।
ঈদযাত্রা নিরাপদ ও শৃঙ্খল রাখতে রেল কর্তৃপক্ষ এবার বেশ কঠোর। কয়েক ধাপে টিকিট যাচাই করে তবেই স্টেশনে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে। তবে বড় পরিবারের সুবিধার্থে একজনের জন্য স্ট্যান্ডিং টিকিটের সুযোগ রাখা হয়েছে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ব্যবস্থাপক সাজেদুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার সব মিলিয়ে মোট ৬০টি ট্রেন ঢাকা থেকে ছেড়ে গেছে। এর মধ্যে ৪৪টি আন্তঃনগর ট্রেন এবং বাকিগুলো লোকাল। এছাড়া যাত্রীদের বাড়তি চাপ সামলাতে ঢাকা ও জয়দেবপুর থেকে একটি করে বিশেষ (স্পেশাল) ট্রেনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল কিছুটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়লেও আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সেখানে আবারো সেই চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে। গতকাল সকাল থেকেই ঘরমুখো মানুষের ভিড়ে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুর পর্যন্ত সদরঘাট থেকে প্রায় ৪০টি লঞ্চ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে গেছে এবং দিনশেষে এ সংখ্যা ৭০ থেকে ৭৫-এ পৌঁছাতে পারে। বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. মুবারক হোসেন জানান, ঈদযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বিশেষ করে লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন রোধে সার্বক্ষণিক মাইকিং ও কঠোর তদারকি করা হচ্ছে।
সড়কপথের ভোগান্তি ও যানজট এড়াতে যাত্রীদের মধ্যে আকাশপথে ঘরমুখো হচ্ছেন অনেক যাত্রী। বাড়তি চাপের কারণে অভ্যন্তরীণ রুটের প্রায় সব এয়ারলাইনসের টিকিট এরই মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। বিশেষ করে ১৭ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার ফ্লাইটে কোনো আসন ফাঁকা নেই বলে জানাচ্ছে এয়ারলাইনসগুলো। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা প্রতিদিন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, সৈয়দপুর, রাজশাহী, যশোর ও বরিশালে প্রায় সাত হাজার যাত্রী পরিবহন করছে।
যাত্রীদের সুবিধার্থে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-সৈয়দপুর রুটে বিশেষ ফ্লাইট চালু করেছে। এয়ারলাইনসগুলোর তথ্যমতে, এবারের ঈদে সৈয়দপুর, যশোর ও রাজশাহী রুটের টিকিটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া ঈদের পরবর্তী ছুটিতে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যাওয়ার টিকিটের চাহিদাও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ যাত্রীই ঝামেলা এড়াতে যাতায়াতের উভয় পথের টিকিট আগেভাগেই নিশ্চিত করে রেখেছেন।










