দেশে গৃহকর্মীদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে সরকারি পর্যায়ে দ্রুত ডেটাবেজ তৈরি এবং সংশোধিত শ্রম আইনে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপসহ বৈশ্বিক মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি বলে মত দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও নীতিনির্ধারকরা। বুধবার (২১ জানুয়ারি) ‘গৃহকর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তায় সংশোধিত শ্রম আইন: সুযোগ, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। বণিক বার্তা এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অক্সফ্যামের যৌথ উদ্যোগে এবং কানাডা সরকারের সহায়তায় সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয়।

সংলাপে বক্তারা উল্লেখ করেন, কেবল আইনি কাঠামো সংশোধনই যথেষ্ট নয়; বরং গৃহশ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যকার ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ নিরসন এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের এই বৃহৎ জনশক্তিকে সুরক্ষার আওতায় আনতে হলে আইনি শব্দচয়ন থেকে শুরু করে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার এবং কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করা এখন সময়ের দাবি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেন, আমাদের সরকারের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। সবকিছু করার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। এটি সরকারের একার সমস্যা নয়, এ সমস্যা প্রত্যেক ঘরে ঘরে। এখানে একটি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ ইস্যু আছে। এই কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হলো—যিনি নিয়োগকারী এবং যিনি কর্মী, তারা আসলে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অবগত নন। এখন গৃহকর্মীরা যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অবগত না থাকেন, তাহলে দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত আমরা সবাই হব। এ জন্য দরকার আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নিয়োগকারীদের—তাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

তিনি বলেন, এ পরিবর্তনের জন্য ঘরে ঘরে কাজ করতে হবে, সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এখানে সরকারের পাশাপাশি এনজিও, বিভিন্ন সংগঠন এবং শ্রমিক নেতাদের দায়িত্ব রয়েছে। সরকার একটি আইনি কাঠামো দিয়েছে, অন্যান্য যে সহযোগিতা দরকার, তা সরকার দেবে। আইন বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্ব সরকারের। তবে অংশীদার আপনারা সবাই। আমরা সবাই মিলে দায়িত্ব নিলে যে কোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকার একটি বড় বিষয়। আমরা যত আলোচনাই করি না কেন, যদি মনোজগতে এই অঙ্গীকার না থাকে, তাহলে ফল আসবে না। সচিব মহোদয় কয়েকটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। প্রথমত, আইন পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা তদারকির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, অনেক সময় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের চেয়ে এগিয়ে যায়, ফলে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রগুলো পিছিয়ে পড়ে। বর্তমানে যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। নীতিমালার ভিত্তিতে যে আইন ও অঙ্গীকার রয়েছে, সেগুলোর আলোকে কোথায় কোথায় প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ন্যূনতম সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, সে দায়িত্ব নিতে আমরা প্রস্তুত।’

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম তার বক্তব্যে আইনের চেয়েও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের মন-মানসিকতার পরিবর্তন না আনলে কেবল ভালো আইন দিয়ে কোনো কাজ হবে না। আমাদের সমাজ শ্রেণিবিভক্ত ও বৈষম্যে জর্জরিত। যারা আমাদের ঘরে এত কাজ করেন, তাদের মর্যাদা কোথায়? তাদের সম্মান না দেয়ার কারণেই দেশে এত ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স ঘটে।’

গৃহশ্রমিকদের শ্রমের গুরুত্ব তুলে ধরে শাহীন আনাম বলেন, ‘ঘরের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা সেই শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে। আমরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। অথচ ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় ৩৬টি পেশা অন্তর্ভুক্ত হলেও গৃহশ্রমিকদের এখনো সেখানে ঠাঁই হয়নি। অনেক বিধি-বিধান থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়নের সংস্কৃতি আমাদের গড়ে ওঠেনি। নিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সরকারকে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে এবং ঘরে ঘরে সচেতনতা পৌঁছে দিতে হবে।’

স্বাগত বক্তব্য রাখেন বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। প্যানেল আলোচকদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর উপপরিচালক (অ্যাডভোকেসি) মো. নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট শারমিন সুলতানা (মৌসুমি), গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের শ্রমিক নেতা ও সমন্বয়কারী আবুল হোসাইন, ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স ন্যাশনাল ফোরামের সভাপতি জাকিয়া সুলতানা এবং সাধারণ সম্পাদক মর্জিনা সুলতানা, কর্মজীবী নারীর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক সানজিদা সুলতানা, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও শ্রমশক্তি সংস্কার আইনের সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন, অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী তারেক আজিজ, সবুজের অভিযান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মাহমুদা বেগম, অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের জেন্ডার ও ইনক্লুশন স্পেশালিস্ট রওশন আক্তার উর্মি এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।

অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া।