চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সাম্প্রতিককালে নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে দ্বীপটি। উভয় পারে একাধিক জেটি নির্মাণের পরও এখনো কাদা মাড়িয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে দ্বীপবাসীকে। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, সরকারি দুটি সংস্থার ঘাট নিয়ে দ্বন্দ্ব ও প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যে ভোগান্তিতে উপকূলীয় দ্বীপটির বাসিন্দারা।
সন্দ্বীপের কুমিরা-গুপ্তছড়া ঘাটের উভয় পাশের উন্নয়নে কাজ করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। সংস্থাটি কুমিরা অংশে একটি এবং সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া অংশে এ পর্যন্ত দুটি জেটি নির্মাণ করেছে। কুমিরা ঘাট অংশের জেটি দিয়ে যাত্রী পারাপার অধিকতর নিরাপদ হলেও সন্দ্বীপ অংশের দুর্ভোগ কোনোভাবেই কাটছে না। চট্টগ্রামের কুমিরা অংশে ১৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় এবং সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া অংশে ১২ কোটি ৪১ লাখ টাকায় দুটি জেটি নির্মাণ করা হয়। এক দশক না পেরোতেই এসব জেটি চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে গুপ্তছড়া অংশে ৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭০০ মিটার দৈর্ঘ্যের আরেকটি জেটি নির্মাণ করা হয়। বিআইডব্লিউটিএর নির্মাণ করা এই জেটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর মাত্র ১১ মাসেই নতুন এ জেটি কার্যকারিতা হারিয়েছে। নদী অংশে নতুন চর জেগে ওঠায় জেটি দিয়ে যাত্রী চলাচল করতে পারছেন না। জোয়ারের সময় নদীর পানিতে নেমে কিংবা ভাটার সময় কাদায় হেঁটে নৌ-যানে উঠতে বাধ্য হচ্ছেন যাত্রীরা। সীমাহীন দুর্ভোগ সত্ত্বেও কোনো সংস্থাই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসছে না।
সন্দ্বীপের প্রধান নৌ-রুট কুমিরা-গুপ্তছড়া টার্মিনাল জেটিঘাট ২০১৩ সালের ৭ নভেম্বর বিআইডব্লিউটিএ মো. আবুল কাশেমের অনুকূলে ইজারা প্রদান করে। ইজারাদার কাজ শুরুর একদিন আগে জেলা পরিষদ মো. আনোয়ার হোসেন নামের একজনকে নৌ পয়েন্টটি ইজারা দিয়ে দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংক্ষুব্ধ হয়ে বিআইডব্লিউটিএর ইজারাদার মো. আবুল কাশেম একই বছরের ১৭ নভেম্বর হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। কোর্ট শুনানি শেষে জেলা পরিষদের ইজারার বিষয়ে ৬ মাসের স্থগিতাদেশ জারি করেন। স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে জেলা পরিষদ (চট্টগ্রাম)
সুপ্রিমকোর্টে আপিল মামলা দায়ের করেন। আপিল বিভাগ শুনানি শেষে দুই মাসের স্থগিত আদেশ বহাল রেখে হাইকোর্ট বিভাগে মূল মামলার শুনানি ও আদেশ প্রদানের জন্য দুই মাস সময় দেন। প্রসঙ্গত, বিআইডব্লিটিএ-এর ইজারা গ্রহণকারী মো. আবুল কাশেমের হাইকোর্টে রিট পিটিশন নং-১১৫১৭/২০১৩ দীর্ঘদিন শুনানির পর ওই রিট পিটিশনটি ২০১৪ সালের ৩ মার্চ ডিসচার্জ হয়েছিল।
উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে তত্কালীন নৌ-পরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি বহুপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে চট্টগ্রাম-৩ সংসদীয় আসনের তত্কালীন সংসদ সদস্য (সন্দ্বীপ), চট্টগ্রাম-৪ আসনের সাংসদ (সীতাকুণ্ড), বিআইডব্লিউটিএ,
চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত ওই সভায় বিআইডব্লিউটিএ ও জেলা পরিষদের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ২ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ উপজেলার অন্তর্গত কুমিরা-গুপ্তছড়া ফেরিঘাট পরিচালনা নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ ও জেলা পরিষদ-চট্টগ্রামের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ চট্টগ্রামের উপপরিচালক নয়নশীল বণিক বার্তাকে বলেন, সন্দ্বীপের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিআইডব্লিউটিএ তিনটি জেটি নির্মাণ ছাড়াও বয়া স্থাপন করেছে। জেলা পরিষদের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এ ঘাটটিকে দেশের অন্যতম নৌ-রুটে পরিণত করতে একাধিক মেগা পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘাটের মালিকানা বিআইডব্লিউটিএর কাছে না এলে নিরাপদ ও আধুনিক নৌ-রুট বাস্তবায়নের কাজ অধরাই থেকে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
সরকারি দুই সংস্থার চুক্তির মধ্যে ছিল চুক্তির মেয়াদ হবে ছয় বছর, যা জেলা পরিষদ পরিচালনা করবে। সে হিসাবে ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর ছয় বছরের সমঝোতা চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়।
এদিকে ২০২০ সালের ৯ জানুয়ারি দেশের বিভিন্ন ঘাট/পয়েন্ট পরিচালনা নিয়ে নৌ-পরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও বিআইডব্লিউটিএর মধ্যে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব ঘাট/পয়েন্ট রক্ষণাবেক্ষণ ও ইজারা প্রদান বিআইডব্লিউটিএর ওপর ন্যস্ত করা হয়। এ কারণে কুমিরা-গুপ্তছড়া নৌ-টার্মিনাল জেটি ঘাট নিয়ে জেলা পরিষদের সঙ্গে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক নবায়ন না করে বিআইডব্লিউটিএ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইজারা প্রদানের মাধ্যমে পরিচালনা করতে চাইছে। কিন্তু জেলা পরিষদ অনড় অবস্থানে থাকায় সন্দ্বীপের ঘাট নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না। দুই সরকারি সংস্থার দ্বন্দ্বের কারণে উভয় ঘাটে যুগোপযোগী কোনো উন্নয়নমূলক কাজ না হওয়ায় প্রাচীন আমলের মতোই দেশের সবচেয়ে অনিরাপদ নৌ-রুটে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে সন্দ্বীপের মানুষ।
সন্দ্বীপের অনিরাপদ নৌ-যোগাযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সাংসদ মাহফুজুর রহমান মিতা বণিক বার্তাকে বলেন, দীর্ঘদিন জেলা পরিষদের কাছে ঘাটের ইজারার দায়িত্ব থাকলেও দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। এ সমস্যা সমাধান হলে চট্টগ্রাম শহরের নিকটবর্তী দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের যাতায়াত অবকাঠামোর উন্নয়নে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন তিনি।









