দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বিটি বেগুন এবং গোল্ডেন রাইসের বাণিজ্যিক অনুমোদন বাতিল করাসহ সব ধরনের জিনগতভাবে পরিবর্তিত শস্য ও খাদ্যদ্রব্যের বাণিজ্যিক অনুমোদন প্রদান থেকে বিরত থাকতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব; বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল, ‘নিজেরা করির’ সমন্বয়কারী খুশী কবির, উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবীর, বীজ বিস্তার ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. এমএ সোবহান, শিসউকের নির্বাহী পরিচালক সাকিউল মিল্লাত মোর্শেদ, বারসিকের গবেষক পাভেল পার্থ, জিএমও বিরোধী মোর্চার সদস্য ইবনুল সাঈদ রানা, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি বদরুল আলম, উন্নয়ন ধারা ট্রাস্টের সদস্য সচিব আমিনুর রসুল, নারী গ্রন্থ প্রবর্তনার সহসভানেত্রী সীমা দাস সীমু, নয়াকৃষি আন্দোলনের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম জনি, বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
চিঠিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, গত ৪ এপ্রিল গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) মিলিতভাবে দেশে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ যুক্তিতে গোল্ডেন রাইস নামক ধানের জাত প্রচলন করতে সরকারি উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক করেছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ইরির ‘হেলদিয়ার রাইস প্রোগ্রাম’ প্রকল্পের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে জিএমও গোল্ডেন রাইস ধানের জাত অবমুক্তির জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছে এবং সরকার অনুমোদনের আশ্বাসও দিয়েছে। ইরি ছাড়াও গোল্ডেন রাইস প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছে মার্কিন দাতব্য সংস্থা বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এবং ধানটির পেটেন্টের স্বত্বাধিকারী হচ্ছে বিদেশী রাসায়নিক কৃষি কোম্পানি সিনজেন্টা।
বাংলাদেশ ধানের আদি নিবাস এবং এ দেশে একসময় ১৫ হাজার জাতের ধান ছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখিত হয়েছে। এখনো বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ৭ হাজার ৫০০ জাতের ধান সংরক্ষিত রয়েছে বলে প্রচার রয়েছে। বাংলাদেশের মতো প্রাণবৈচিত্র্য নির্ভরশীল দেশে জিনগতভাবে পরিবর্তিত ধান ও খাদ্য ফসলের প্রবর্তন উদ্বিগ্ন করেছে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের।
তারা মনে করিয়ে দেন, গত ১৭ এপ্রিল ফিলিপাইনের আপিল আদালত নির্দিষ্টভাবে গোল্ডেন রাইস এবং বিটি বেগুনের বাণিজ্যিক চাষ বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত (নিরপেক্ষ ও পর্যাপ্ত বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা) এবং আইনি বাধ্যবাধকতা (বায়োসেফটি রুল, কার্টেহেনা প্রটোকলসহ অন্যান্য) মানার আগে এগুলো বাণিজ্যিকভাবে প্রচলন করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রায়ে গোল্ডেন রাইসের বায়োসেফটি অনুমোদনও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
যেখানে অন্য কোনো দেশ গোল্ডেন রাইসের বাণিজ্যিক অনুমোদন দেয়নি এবং ফিলিপাইনের আদালত সুনির্দিষ্টভাবে এ অনুমোদনের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে, যেখানে বাংলাদেশে ভিটামিন ‘এ’-র বিকল্প প্রাকৃতিক উৎস বিদ্যমান ও সহজলভ্য সেখানে ভিটামিন ‘এ’ বেশি পাওয়ার অজুহাতে জিনগতভাবে পরিবর্তিত ও কোম্পানির পেটেন্টকৃত গোল্ডেন রাইসের বাণিজ্যিক প্রচলন করার কোনো সুযোগ এ দেশে নেই বলে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন। তারা চিঠিতে উল্লেখ করেন, গোল্ডেন রাইসের আগে জিনগত পরিবর্তিত বিটি বেগুনের বাণিজ্যিক প্রচলনও বাংলাদেশ সরকার তড়িঘড়ি করে অনুমোদন দিয়েছিল। বিটি বেগুন বাংলাদেশ, ভারত ও ফিলিপাইন একই সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেও ভারত কিংবা ফিলিপাইন বাণিজ্যিক প্রচলনের অনুমোদন দেয়নি।
তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সব ধরনের জিনগতভাবে পরিবর্তিত শস্য ও খাদ্যদ্রব্যের বাণিজ্যিক অনুমোদন প্রদান থেকে বিরত থাকতে এবং এরই মধ্যে প্রদানকৃত অনুমোদন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।










