জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্য আসামিরা হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। আসামিদের সবাই বর্তমানে পলাতক। এর আগে গত বছরের নভেম্বরে দলটির সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

এদিকে রায়ে ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খানের সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্তেরও আদেশ দেয়া হয়েছে। আর ওই সম্পত্তি জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

রায়ের পর এক সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আনা চারটি করে অভিযোগ নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল তাদের প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন এবং অভিযোগভেদে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায়ও দেয়া হয়েছে।’

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে ওবায়দুল কাদের ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সহিংসভাবে দমনের জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। এ আন্দোলনে দলের সহিংস অবস্থান ও পদক্ষেপ নিতে বাহাউদ্দিন নাছিম সহায়তা করেছিলেন।

অন্যদিকে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং হত্যা ও সহিংসতার খবর প্রচারে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন মোহাম্মদ আলী আরাফাত। যুবলীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামানোর জন্য শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন নিখিলকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, নিখিল নিজে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন। আর সশস্ত্র ক্যাডারদের জড়ো করা এবং হামলার সমন্বয়ের জন্য ছাত্রলীগের সাদ্দাম ও ইনানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

অভিযুক্তদের জ্ঞাতসারে ও সংশ্লিষ্টতায় সাধারণ জনগণের ওপর ব্যাপক ও পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। এসব হামলায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি আন্দোলনকারী নিহত এবং ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন।

মোট ৫৫৭ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পড়েন ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। আন্দোলন চলাকালে শহীদ ও আহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ওবায়দুল কাদেরসহ মৃত্যুদণ্ড পাওয়া পাঁচ আসামির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাজেয়াপ্ত এসব সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এ রায় বাস্তবায়ন করবে সরকার। তাদের (আসামি) কার কোথায় কী সম্পদ আছে রাষ্ট্র বা সরকার সেটা খুঁজে বের করবে এবং সে অনুযায়ী তাদের যে সম্পদ পাওয়া যাবে তার অর্ধেক বাজেয়াপ্ত হবে।’

আইনানুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের এ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর ৩০ দিন পর্যন্ত আসামিদের আপিল করার সুযোগ থাকে। এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘৩০ দিন পর্যন্ত কোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা অন্য কোনো ব্যবস্থায় যাওয়ার হয়তো সুযোগ নেই। কিন্তু ৩০ দিন পর থেকে বাংলাদেশ সরকারের এ রায় বাস্তবায়ন করতে কোনো বাধা নেই।’