বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব জমিতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় উদ্যোগ নেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পটির নামকরণ হয়েছে। চট্টগ্রামের সিআরবিসংলগ্ন ছয় একর জমিতে নির্মিতব্য প্রকল্পটির নাম হবে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব স্বাস্থ্যসেবা কমপ্লেক্স। নভেল করোনাভাইরাসজনিত বিধিনিষেধের কারণে কাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হলেও শিগগিরই প্রকল্পের ভৌতকাজ শুরু করতে যাচ্ছে বাস্তবায়নকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ের প্রথম পিপিপি প্রকল্পটির নামকরণ বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের নামে করতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কাছে আবেদন করা হয়। গত ২৭ অক্টোবর ট্রাস্টি বোর্ড সভায় রেলের আবেদনটির অনুমোদন দেয়া হয়। রেলওয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব স্বাস্থ্যসেবা কমপ্লেক্স’ হিসেবে নামকরণের অনুমতি দেয় ট্রাস্ট। পরে ৬ ডিসেম্বর ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশুরা হোসেন স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে সম্মতির বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ৭ ডিসেম্বর রেলপথ মন্ত্রণালয় প্রকল্পটির নতুন নামকরণ-সংক্রান্ত বিষয় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে জানায়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. আলী কবীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে চট্টগ্রামের সিআরবি চত্বরে হাসপাতাল নির্মাণের নামকরণের বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়।
জানা গেছে, অনুমোদনপ্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকের কাছে এ বিষয়ে নির্দেশনা আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের ভৌতকাজ শুরু করবে বাস্তবায়নকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ। এরই মধ্যে প্রকল্পাধীন এলাকায় মাটি পরীক্ষা, গভীর নলকূপ বসানোসহ আনুষঙ্গিক কাজ সম্পাদন করেছে সংস্থাটি। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত লকডাউনের কারণে নির্মাণকাজ শুরু করতে দেরি হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ আরো বাড়ানো হতে পারে বলে মনে করছে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ‘স্টাবলিশমেন্ট অব এ ৫০০ বেড মাল্টি স্পেশিয়ালিটি হসপিটাল অ্যান্ড এ ১০০ সিট মেডিকেল কলেজ অন বাংলাদেশ রেলওয়ে সিট অ্যাট চিটাগাং’ শিরোনামে প্রকল্পটি রেলওয়ের প্রথম পিপিপি প্রকল্প। এর আগে রেলওয়ে চট্টগ্রামে নিজস্ব জমিতে প্রথম পিপিপি পদ্ধতিতে শপিং মলসহ হোটেল কাম গেস্টহাউজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পের বেসরকারি সংস্থাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভূমি বুঝিয়ে দিতে না পারায় প্রকল্পটির কার্যক্রম কার্যত থেমে যায়। এ কারণে চট্টগ্রামের সিআরবিতে নির্মাণাধীন হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ প্রকল্পটি রেলওয়ের প্রথম পিপিপি প্রকল্প।
প্রকল্প পরিচালক ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) মো. আহসান জাবির বণিক বার্তাকে বলেন, পিপিপি প্রকল্পের আওতায় রেলওয়ে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে সিআরবি এলাকায় একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণ করছে। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পটির কাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়েছে। রেলওয়ে প্রকল্পটির নামকরণ বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিবের নামে করতে সার্বিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছে। শিগগিরই এ নামে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে।
এর আগে ২০১২ সালের দিকে রেলওয়ে অব্যবহূত নিজস্ব জমিতে হাসপাতালসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিনিয়োগের চেষ্টা করে। এর পর পরই রেলের জমিতে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ সিটের মেডিকেল কলেজ নির্মাণের বেসরকারি অংশীদার নির্বাচনের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। এর অধীনে ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) সভায় প্রকল্পটি পিপিপিতে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রেলের প্রস্তাবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থেকে ‘স্টাবলিশমেন্ট অব এ ৫০০ বেড মাল্টি স্পেশিয়ালিটি হসপিটাল অ্যান্ড এ ১০০ সিট মেডিকেল কলেজ অন বাংলাদেশ রেলওয়ে সিট অ্যাট চিটাগাং’ শিরোনামে দরপত্র দলিল প্রস্তুত করা হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ প্রকল্প নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯৮ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা।
২০১৮ সালের ১০ ডিসেম্বর খসড়া চুক্তিপত্র অনুমোদন করে আইন মন্ত্রণালয়। ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই সিসিইএর বৈঠকে পিপিপি প্রকল্পটি পুনরায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি পিপিপি চুক্তিপত্র সিসিইএ কমিটিতে দ্বিতীয়বারের মতো পাঠানো হয়। এরপর ২৮ জানুয়ারি সিসিইএ কমিটির বৈঠকের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি পিপিপি প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়, যা একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।
রেলওয়ের প্রকৌশল দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ১২ বছর (নিয়োগের তারিখ থেকে)। চুক্তির সময়কাল ধরা হয়েছে ৫০ বছর (নির্মাণকালসহ)। চুক্তি অনুযায়ী, বেসরকারি অংশীদার বা ইউনাইটেড গ্রুপ চুক্তির সময়কালে অবকাঠামোর ডিজাইন, নির্মাণ, অর্থায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। চুক্তির মেয়াদ শেষে পূর্ণাঙ্গ চালু ও ভালো অবস্থায় সামগ্রিক অবকাঠামো সরকারি অংশীদার বা বাংলাদেশ রেলওয়েকে হস্তান্তর করবে। আর্থিক চুক্তি অনুযায়ী প্রাইভেট পার্টনার প্রজেক্ট ডেভেলপমেন্ট ফি হিসেবে পিপিপি কর্তৃপক্ষকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা দেবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বশর্ত হিসেবে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ বাংলাদেশ রেলওয়েকে প্রিমিয়াম হিসেবে দেবে ৫ কোটি টাকা। এছাড়া চুক্তি স্বাক্ষরের তিন বছরপূর্তিতে প্রথম বার্ষিক ফি হিসেবে ৭৫ লাখ, চতুর্থ বছরপূর্তিতে দ্বিতীয় বার্ষিক চুক্তি ফি ৭৫ লাখ, পঞ্চম বছরপূর্তিতে চুক্তি ফি দেড় কোটি টাকা বাংলাদেশ রেলওয়েকে দিতে হবে। ষষ্ঠ বছরও একই পরিমাণ ফি দেবে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ। তবে এরপর থেকে প্রতি তিন বছর অন্তর চুক্তির মেয়াদকাল পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে ফি বাড়বে।
প্রকল্পের নথি সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণকালে প্রথম পর্যায়ের তিন বছরে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ কমপক্ষে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ করবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো ২৫০ শয্যার হাসপাতাল কার্যক্রম চালু করবে পরবর্তী অন্তত ২৪ মাসের মধ্যে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ১০ বছরের মধ্যে বেসরকারি অংশীদার ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজকে ৫০ আসনের মেডিকেল কলেজ ও চুক্তির নির্ধারিত ১২ বছরের মধ্যে আরো ৫০ আসনের মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম শুরু করতে হবে। প্রকল্পের ছয় একর জমির মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ২ দশমিক ৪২ একর ও দ্বিতীয় ধাপে ৩ দশমিক ৫৮ একর জমি ব্যবহার করবে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ। প্রকল্পের অধীনে রেলওয়ে কর্মীরা ২০ শতাংশ কম মূল্যে চিকিৎসাসহ আনুষঙ্গিক সুবিধা পাবে। এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে বিশ্বমানের টারশিয়ারি লেভেলের হাসপাতাল কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
রেলের পরিচালনাধীন হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এসব কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে রেলের পরিচালনাধীন হাসপাতালের বিষয়ে দেয়া প্রতিবেদনগুলো যুগোপযোগী বলে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চট্টগ্রাম ছাড়াও ঢাকার রেলওয়ে হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। তবে বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে চট্টগ্রামে সিআরবিতে নির্মিতব্য হাসপাতাল নির্মাণের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা প্রকাশ করে এ প্রকল্পের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
এদিকে সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প বাতিল বা সরিয়ে নেয়ার দাবিতে আন্দোলন করছেন পরিবেশবাদীরা। তারা বলছেন, স্থানটিতে হাসপাতাল হলে পুরো সিআরবি এলাকা বিরানভূমিতে পরিণত হবে। পাহাড় ও গাছ কেটে হাসপাতাল নির্মাণ হলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এছাড়া হাসপাতালটিকে কেন্দ্র করে আরো যেসব অবকাঠামো তৈরি হবে, তাতে সিআরবি ও আশপাশ এলাকার সবুজ পরিবেশ, গাছপালা, পাখ-পাখালি ও জীববৈচিত্র্যের বিনাশ হবে। কোলাহলময় হয়ে উঠবে এলাকাটি। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালের জন্য কোনো গাছ কাটা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।









