ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রায় আড়াই কোটি বাসিন্দার দৈনন্দিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবহার করা হয় ল্যান্ডফিল পদ্ধতি। লোকালয় থেকে দূরে ফাঁকা বা নিচু জমিতে বর্জ্য পদার্থ জমা করা কিংবা মাটিচাপা দেয়ার পদ্ধতিই হলো ল্যান্ডফিল। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পুরনো এ পদ্ধতিতেই রাজধানীর বর্জ্য অপসারণ করা হয়। আর এ কাজে যে দুটি ল্যান্ডফিল রয়েছে, সেগুলোর ধারণক্ষমতাও শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবে দুই সিটি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণের মাতুয়াইল ও উত্তরের আমিনবাজার ল্যান্ডফিলকে বর্ধিত করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মেগা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে ঢাকার এ বিপুল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি কাঠামোর মধ্যে আসবে।
অবিভক্ত ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৮৯ সালে ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে মাতুয়াইলে ল্যান্ডফিল স্থাপন করা হয়। ১৭ বছরের মাথায় শেষ হয় ল্যান্ডফিলটির বর্জ্য ধারণক্ষমতা। এরপর ২০০৬ সালে আরো ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৮৯ সালে অধিগ্রহণ করা ৫০ একর ভূমিতে বর্জ্যের উচ্চতা প্রায় ৭০ ফুটে পৌঁছেছে। ওই ভূমিতে এখন পরিবেশসম্মতভাবে ল্যান্ডফিল সমাপ্তকরণ বা পোস্টক্লোজারের কাজ চলছে। পাশাপাশি পরে অধিগ্রহণ করা বাকি ৫০ একর ভূমিরও বেশির ভাগ জায়গায় ল্যান্ডফিল সমাপ্তকরণ চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, এক-দেড় বছর পর এ অংশেরও বর্জ্য ধারণক্ষমতা ফুরিয়ে যাবে। তবে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. বদরুল আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, মাতুয়াইলে এক-দেড় বছরের মধ্যে বর্জ্য ধারণক্ষমতা শেষ হয়ে আসছে, কথাটি সঠিক নয়। বর্তমান ধারণক্ষমতায় আমরা ২০২৭ সাল পর্যন্ত বর্জ্য অপসারণ করতে পারব। এরপর আর আমাদের পক্ষে বর্তমান ল্যান্ডফিলে বর্জ্য অপসারণ সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৫৪টি ওয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ২০০৯ সালে আমিনবাজারে ৫৪ দশমিক ৮৮ একর জমিতে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু হয়। জাইকার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০১৭ সালে এখানে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু এর পর থেকে সেখানে ভার্টিকল এক্সটেনশন পদ্ধতিতে বা মূল ভূমির ওপর ৮০ মিটার প্রস্থ করে বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে। এক-দেড় বছরের মধ্যে এখানেও আর বর্জের জন্য জায়গা থাকবে না।
ডিএনসিসির তথ্যমতে, ৫৪টি ওয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বর্তমানে দুটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্প দুটি হলো, ৭৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আমিনবাজার ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্প এবং ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক যান ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহের মাধ্যমে সড়ক পরিষ্কার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকাজের উন্নয়ন প্রকল্প। এ দুটির আওতায় বর্তমানে উত্তর সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকাজ পরিচালিত হচ্ছে।
ডিএনসিসির নতুন সংযুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডের বিষয়ে ওই দুই প্রকল্পের পরিচালক ও ডিএনসিসির অতিরিক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এসএম শফিকুর রহমান বলেন, নতুন সংযুক্ত ১৮টি ওয়ার্ড নিয়ে আমাদের বিশাল পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এ ওয়ার্ডগুলোতে কোনো সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন বা এসটিএস নেই। আমরা প্রতি ওয়ার্ডে দুটি করে মোট ৩৬টি এসটিএস ও একটি ওয়ার্ড অফিস স্থাপন করব। নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করার জন্য ইকো টাউন কনসেপ্টের মাধ্যমে ডেমরার পাশে নাছিরাবাদে আরেকটি ল্যান্ডফিল নির্মাণের মাধ্যমে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। এক-দেড় বছরের মধ্যে এসব কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানান ডিএনসিসির এ কর্মকর্তা। তখন ঢাকা উত্তরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সৃষ্ট সংকটও কেটে যাবে।
ডিএসসিসির নথিপত্র বলছে, গত পাঁচ বছরে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে প্রায় ৪৭ লাখ টন বর্জ্য চূড়ান্তভাবে অপসারিত হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী গড়ে বছরে ১০-১২ শতাংশ বর্জ্য বাড়ছে ঢাকা দক্ষিণে। ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ তিনটি হুইলডোজার, পাঁচটি এক্সক্যাভেটর, পাঁচটি বুলডোজারের মাধ্যমে দৈনিক ৭০০ ট্রিপে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টন বর্জ্য অপসারণ করে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে পাঠাচ্ছে। এছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতি বছর ১ লাখ ২০ হাজার টন বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পুনঃচক্রায়ণ হচ্ছে বলে সিটি করপোরেশনের একটি সূত্র জানিয়েছে।
ডিএসসিসির বর্জ্যের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ হাসপাতাল বর্জ্য। দক্ষিণ ঢাকায় অবস্থিত ১ হাজার ৫০টি হাসপাতাল থেকে দৈনিক ১০টি কাভার্ড ভ্যানের মাধ্যমে ১২ টন হাসপাতাল বর্জ্য মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে অপসারণ করা হয়। ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা বলেন, সাধারণ বর্জ্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ক্ষতিকর হাসপাতাল বর্জ্য। তাই হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আলাদা নজর দিতে হয় ডিএসসিসিকে।
রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি বড় ত্রুটির কথা উল্লেখ করেন নগরবিদ ইকবাল হাবিব। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বর্জ্য যখন বাসাবাড়ি বা এসটিএস থেকে সংগ্রহ করা হয়, তখনই বর্জ্যকে শ্রেণীভিত্তিকভাবে আলাদা করে ফেলা দরকার। কোনটা গৃহস্থালি বর্জ্য, কোনটা কাঁচা বর্জ্য, কোন বর্জ্য থেকে গ্যাস উত্পন্ন হবে, কোন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উত্পন্ন হবে, কোনটা পুড়িয়ে ফেলতে হবে, এভাবে আলাদা করে তারপর ল্যান্ডফিলে অপসারণ করা উচিত। উন্নত বিশ্বে এটা অনেক আগেই শুরু হয়েছে। আমাদের দেশে কেউ যদি আলাদাভাবে কাঁচা বর্জ্য, ইলেকট্রিক বর্জ্য দেয়, তবু এটাকে একত্রে মিশিয়ে ল্যান্ডফিলে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে গিয়ে আবার এটাকে আলাদা করবে। এ বড় আজব পদ্ধতি।
উন্নত বিশ্বে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা হলেও আমাদের দেশে সে ব্যবস্থা নেই উল্লেখ করে ইকবাল হাবিব বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গ্যাস তৈরির কথা ভাবছে। এটি যদি বাস্তবায়ান হয়, তাহলে আশা করা যায়, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আসবে।
ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাদের বড় পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বর্তমানে ডিএসসিসির বর্জ্য কোনো ধরনের প্রক্রিয়াকরণ ছাড়া সরাসরি ল্যান্ডফিলে ফেলা হচ্ছে। ফলে ল্যান্ডফিলে বর্জ্য ধারণক্ষমতা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। জমির দুষ্প্রাপ্যতার কথা বিবেচনায় রেখে উন্নত বিশ্বের মতো বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে বর্জ্যের আয়তন কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বায়ো গ্যাস প্লান্ট, কমপোস্ট প্লান্ট, রিসাইক্লিং প্লান্ট, কন্ট্রাকশন ওয়াস্ট রিসাইক্লিং প্লান্ট, ফুড ওয়াস্ট রিসাইক্লিং প্লান্ট ইত্যাদি প্রকল্প সিটি করপোরেশন হাতে নিয়েছে।
ডিএসসিসির একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এরই মধ্যে বেশ কার্যকরী কয়েকটি পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ। এ লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর একনেক সভায় ১৪ হাজার ৫৪৪ কোটি ১৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকার একটি প্রকল্প পাস হয়েছে। প্রকল্পটির নাম ‘মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণসহ ভূমি উন্নয়ন’। এ প্রকল্পের আওতায় মোট ৮১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে ৫০ একরে বর্জ্য অপসারণ করা হবে এবং বাকি ৩১ একরে বর্জ্য পোড়ানোর জন্য রিসোর্স রিকভারি ফ্যাসিলিটিজ (আরআরএফ) স্থাপন করা হবে। ডিএনসিসিও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করার লক্ষ্যে নতুন আরেকটি প্রকল্প শিগগিরই শুরু করতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনাও প্রণয়ন হয়েছে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। তবে একনেকে পাস হওয়ার আগে এ ব্যাপারে কিছু বলতে রাজি হননি ডিএনসিসির কর্মকর্তারা।










