সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মশার অস্বাভাবিক যন্ত্রণা রাজধানীবাসীর জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। প্রশ্ন উঠছে মশা নিধন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়েও। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকেও এ নিয়ে নেয়া হচ্ছে নানা  উদ্যোগ। বছর বছর এ খাতে বাজেটও বাড়ছে দ্বিগুণ-তিন গুণ হারে। বরাদ্দের ৯০ শতাংশই ব্যয় হয় কীটনাশক ক্রয়ে। তবু মশা থেকে রেহাই পাচ্ছে না ঢাকাবাসী।

কীট গবেষকরা বলছেন, সিটি করপোরেশনের মশা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতেই ভুল রয়েছে। মশা নিয়ন্ত্রণের উপযুক্ত সময় হলো যখন মশা কম থাকে। কিন্তু যখন মশা বেড়ে যায় বা মশার যন্ত্রণায় নগরবাসী অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, তখন দুই সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে ক্রাশ প্রোগ্রাম, বিশেষ অভিযানসহ অনেক কর্মসূচি হাতে নেয়। ভুল সময়ে গৃহীত এসব কর্মসূচিতে লাভ হয় সামান্যই।

তবে গবেষকদের যুক্তি মানতে নারাজ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা মেনেই মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করে সিটি করপোরেশন।

প্রতি বছর জানুয়ারিতে মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পেলেও এ মৌসুমে গত নভেম্বর থেকেই মশা বেড়েছে অনেক বেশি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর ঢাকায় মশার ঘনত্ব বেড়েছে চার গুণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি মশা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে আসছে বর্ষায় মশাবাহিত রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করবে। মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ক্রাশ প্রোগ্রাম, বিশেষ অভিযান, সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পরও মশার উপদ্রব কমছে না।

কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার দুই নগর যে পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ করছে, এতে কখনই মশা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। মশা বেড়ে গেলে নগরের লোকজন ওষুধ ছিটিয়ে মশা মেরে ফেলে। অথচ ওষুধ না ছিটালেও একদিন বা দুইদিনের মাথায় স্বাভাবিকভাবেই মশাগুলো মরে যাবে।’

মশা মারার জন্য ওষুধ ছিটানোর পদ্ধতি সঠিক নয়—এর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সাবেক গবেষক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুব সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনবরত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মশার দেহে কীটনাশক সহন ক্ষমতা বেড়ে যায়। প্রতিটি প্রাণীদেহেই প্রকৃতিগতভাবে এ সহন ক্ষমতা তৈরি হয়।’

গবেষকদের মতে, উচ্চমাত্রার কীটনাশক ছিটানোর পরও সহন ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে এখন আর আগের মতো মশা মরছে না। তাছাড়া একেক স্থানের মশার জন্য একেক ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু সিটি করপোরেশন সব জায়গাতে একই ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ করে থাকে। মশার উপদ্রব বাড়ার এটিও একটি কারণ।

মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশকের প্রতি অধিক ঝুঁকে পড়ার বদলে ‘সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা’ পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়ে কীট গবেষক কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে প্রথমত চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। অপরিচ্ছন্ন নোংরা পরিবেশে মশা বেশি জন্মে। এটি হচ্ছে ১ নম্বর এবং প্রধান কাজ। দ্বিতীয়ত, জৈবিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে কোথায় কোথায় মশা বেশি, কোন ধরনের মশার উপদ্রব বেশি এবং এ মশার জন্য কোন ওষুধ কতটুকু ছিটাতে হবে, তা নির্ণয় করে ওই জায়গায় ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। যেন এসব জায়গায় নতুন করে মশা জন্মাতে না পারে। এছাড়াও মশার অতিরিক্ত প্রজনন বন্ধ করার জন্য জলাশয়ে মাছ, হাঁস ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত রাসায়নিক ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চতুর্থত, সাধারণ জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে হবে। এ চারটিকে একত্রে আমরা ‘সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা’ বলি।

মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক প্রয়োগ মূলত তৃতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম। এর আগের গুরুত্বপূর্ণ আরো দুটি পর্যায় অর্থাৎ পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং জৈবিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ বাদ রেখে সিটি করপোরেশন কীটনাশকের প্রতিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। দুই সিটি করপোরেশনের গত পাঁচ বছরের বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্প্রে বা ফগার মেশিন বাদে শুধু কীটনাশক ক্রয়ের জন্য ৯০ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়।

গত পাঁচ বছরে দুই সিটি করপোরেশন মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে ৩২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। এর মধ্যে ২৪০ কোটি ৬১ লাখ টাকাই মশক ওষুধ ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন গত পাঁচ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দকৃত ১৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার মধ্যে ১২১ কোটি টাকা এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১৩৫ কোটি ১৩ লাখ টাকার মধ্যে ১১৯ কোটি টাকা রাসায়নিক ওষুধ কেনার জন্য ব্যয় করেছে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মশক নিয়ন্ত্রণে ৭০ কোটি টাকার মধ্যে ৪০ কোটি টাকা এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৩৫ কোটি টাকার মধ্যে ৩০ কোটি টাকা রাসায়নিক ওষুধ ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ রেখেছে।

বাজেট বিশ্লেষণে আরো দেখা গেছে, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে গত দুই বছরের বাজেটের পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বেশি। চলতি অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মশক নিধন কার্যক্রমে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৭০ কোটি টাকা। পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মশক নিধন কার্যক্রমে এ সিটির বরাদ্দ ছিল ২৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চলতি অর্থবছরে মশক নিধন কার্যক্রমের বরাদ্দ ৩৫ কোটি টাকা। পাঁচ বছর আগে (২০১৬-১৭ অর্থবছর) এ খাতে দক্ষিণ সিটির বরাদ্দ ছিল ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে একই খাতে গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) বরাদ্দ ছিল ৫৮ কোটি টাকা এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বরাদ্দ ছিল ৪৩ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঢাকা উত্তরে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণে ২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ঢাকা উত্তরে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ঢাকা দক্ষিণে ১৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা মশক নিয়ন্ত্রণের জন্য বরাদ্দ ছিল।

পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চেয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন চলতি অর্থবছরে মশক নিধনে দ্বিগুণ বরাদ্দ দিয়েছে। আবার ঢাকা দক্ষিণ তাদের পাঁচ বছর আগের বরাদ্দের চেয়ে চলতি অর্থবছরে এ খাতের বরাদ্দ দ্বিগুণ করেছে। পাঁচ বছর আগের বরাদ্দের চেয়ে তিন গুণ বেশি বরাদ্দ নিয়ে মশা নিধনে মাঠে আছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।

দ্বিগুণ-তিন গুণ বরাদ্দ নিয়েও মশা নিয়ন্ত্রণে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে দুই সিটি করপোরেশন। অবশ্য বরাদ্দের পুরো টাকাও খরচ করছে না তারা। যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তাতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ব্যয়কৃত অর্থের সদ্ব্যবহার যদি হতো, তবুও নগরবাসী মশার উপদ্রব থেকে মুক্তি পেত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। নগর বিশেষজ্ঞরা বলেন, সিটি করপোরেশনের উচিত দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল এবং গবেষকদের পরামর্শ নিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ অভিযানে মাঠে নামা। তবেই জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের বরাদ্দ ৭০ কোটি টাকা বেশি মনে হলেও জনবহুল ঢাকার জন্য এটি খুব বড় কোনো বরাদ্দ নয়।’

সেলিম রেজা বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের পক্ষে একা মশা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন কাজ। আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি। আমাদের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে এ ব্যাপারে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসবে আশা করা যায়।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম আমিন উল্লাহ নুরীও মনে করেন, জনগণ সচেতন ও সতর্ক না হলে মশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের জনগণ সচেতন নয়। অনেকেই ছাদবাগান করেন কিন্তু বাগান পরিষ্কারের ব্যাপারে উদাসীন। মশা বিস্তারে জনগণের অসচেতনতা বড় অংশে দায়ী বলে মনে করি।’

মশা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ভুলের ব্যাপারটি তিনি অস্বীকার করে বলেন, আমরা সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনা মেনেই মশা নিধন অভিযান করে থাকি। মশার জৈবিক উৎপাদন ও উড়ন্ত মশা দুটোই ক্ষতিকর। তাই উড়ন্ত মশা নিধন ও মশার লার্ভা ধ্বংসের জন্য আমরা ওষুধ প্রয়োগ করি।’ কীটনাশক ক্রয়ে বাজেটের ৯০ শতাংশ বরাদ্দের ব্যাপারে তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য বিষয়ে আমাদের আলাদা বাজেট থাকে বলেই মশক নিধন কার্যক্রমে কীটনাশক ক্রয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়।