তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এসব শর্ত ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করতে চায় বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘সব একসঙ্গে করা যাবে না, আমাদের মতো করে করব।’
সচিবালয়ে গতকাল আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার আগে কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও সচিবালয়ে বৈঠক করেন।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আইএমএফের সঙ্গে ঋণ কর্মসূচি চলছে এবং কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলছে। কর্মসূচির বিপরীতে যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করা হবে। সব একসঙ্গে করা যাবে না, আমাদের মতো করে করব। এপ্রিলে ওয়াশিংটনে আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে সব বিষয়ে আলোচনা হবে।’
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সরকার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি উল্লেখ করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রমজান এবং যুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে, কিন্তু জ্বালানি সংকট থাকা সত্ত্বেও এবার ঈদে পরিবহন সংকট হয়নি। পরিবহন ভাড়া বাড়েনি। মানুষ নির্বিঘ্নে বাড়ি যেতে ও ফিরতে পেরেছে। এবার রমজানে দ্রব্যমূল্যও স্থিতিশীল ছিল। গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন নিয়েও এবার অস্থিরতা তৈরি হয়নি। সঠিক সময়ে শ্রমিকদের বেতন দেয়া হয়েছে।’
‘দায়িত্ব নেয়ার পর আগের অর্থনীতির খারাপ অবস্থা আমরা পেয়েছি’ উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ব্যাংক খাত, পুঁজিবাজার খারাপ অবস্থায় আছে এবং কর-জিডিপি হারও অনেক কম। অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব সংকট উত্তরণ সম্ভব। আমরা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যেমন—ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বিতরণ, কৃষি ঋণ মওকুফ ইত্যাদি কাজ করছি। সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য একটার পর একটা পদক্ষেপ নিচ্ছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই অর্থনৈতিক কারণে অনেকগুলো উন্নয়ন প্রকল্প থমকে গেছে। এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে একটা জায়গা নিয়ে যেতে হবে, এজন্য বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।’ অর্থনীতিকে একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ডিরেগুলেশন রিফর্মস, ব্যবসা সহজীকরণ, ব্যবসার খরচ কমানো ইত্যাদি ব্যাপারে নজর দেয়া হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। আগামী বাজেটে এসবের প্রতিফলন থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের ২০২৩ সালের জানুয়ারির সভায় বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন হয়। এর মধ্যে বর্ধিত ঋণ সহায়তা বা বর্ধিত তহবিল (ইসিএফ অ্যান্ড ইএফএফ) থেকে ৩৩০ কোটি ডলার এবং রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির (আরএসএফ) আওতায় ১৪০ কোটি ডলার দেয়ার কথা ছিল। তবে গত বছরের ডিসেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ঋণ কর্মসূচির আওতায় আরো বাড়তি অর্থ দেয়ার অনুরোধ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইএমএফের পর্ষদ বাংলাদেশের জন্য ইসিএফ অ্যান্ড ইএফএফের আওতায় মোট ৪১০ কোটি ডলার অনুমোদন করে। এর সঙ্গে আরএসএফের আওতায় ১৪০ কোটি ডলার মিলিয়ে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৫০ কোটি ডলারে।
প্রথমে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত এ ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ নির্ধারিত ছিল। তবে ঋণের আকার বাড়ার কারণে ইসিএফ অ্যান্ড ইএফএফের অধীনে এর মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচ কিস্তিতে আইএমএফের কাছ থেকে ৩৬৩ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। ঋণের ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ গত বছরের ডিসেম্বরে ছাড় করার কথা ছিল। তবে ঋণ কর্মসূচির অধীনে শর্ত ও সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে নতুন রাজনৈতিক সরকার কী অবস্থান নেয় সেটি দেখার জন্য অর্থছাড়ের বিষয়টি কিছুটা পিছিয়ে গেছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইএমএফের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন জানান, যেকোনো অর্থায়নসংক্রান্ত আলোচনা সব সময়ই নীতিগত আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সব দেশই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত যুদ্ধ পরিস্থিতি অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফ নিবিড়ভাবে কাজ করছে।










