ঢাকায় বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে ধামমন্ডি ও উত্তরায় চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু করেছিল রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। ভালো মানের এসি বাস, নিয়ম মেনে চলাচল, টিকিট সিস্টেম, লাইনে দাঁড় করিয়ে যাত্রীদের বাসে ওঠানোর মতো বিষয়গুলো চক্রাকার বাস সার্ভিসকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তুলেছিল। জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও ‘অতিলোভে’ চক্রের বাইরে চলতে শুরু করায় নিয়মিত যাত্রীদের হারাতে শুরু করে বিআরটিসির চক্রাকার বাস। শেষ পর্যন্ত বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বন্ধ করে দেয়া হয় চক্রাকার বাসের সবক’টি রুট।
ঢাকা শহরের যানজট নিরসন ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো—এ দুটিই ছিল চক্রাকার বাস সার্ভিস চালুর মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক বাস চালুর যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেও এ রুটগুলো চালু করা হয়। ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক বাস ব্যবস্থা বা বাস রুট র্যাশনালাইজেশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের শুরুতে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করে দিয়েছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এ কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকেই চালু হয় চক্রাকার বাসগুলো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চক্রাকার বাসগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেবল যাত্রীরাই বঞ্চিত হচ্ছেন না, ঢাকায় কোম্পানিভিত্তিক বাস ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগও পিছিয়ে পড়ছে।
গত বছরের ২৭ মার্চ ‘চক্রাকার এসি বাস সার্ভিস’ নাম দিয়ে ধানমন্ডি-নিউমার্কেট-আজিমপুরের মধ্যে দুটি নতুন বাস রুট চালু করা হয়। আজিমপুর-নিউমার্কেট-সায়েন্সল্যাব-ধানমন্ডি ২-সাতমসজিদ রোড-ধানমন্ডি ২৭-সোবহানবাগ-রাসেল স্কয়ার-কলাবাগান ৬ নম্বর রোড-সায়েন্সল্যাব-নিউমার্কেট-আজিমপুর-পলাশী-নীলক্ষেত-কাঁটাবন-বাটা ক্রসিং-সায়েন্সল্যাব-সাতমসজিদ রোড মধ্যে একটি রুট চালু করা হয়। আরেকটি রুট চালু করা হয় সোবহানবাগ থেকে শুরু করে রাসেল স্কয়ার-কলাবাগান-সায়েন্স ল্যাব-বাটা সিগন্যাল (এলিফ্যান্ট রোড)-কাঁটাবন-নীলক্ষেত-পলাশী-আজিমপুর-নিউমার্কেট-সায়েন্স ল্যাব-কলাবাগান-সোবহানবাগ-২৭ নম্বর রোড পূর্ব মাথা থেকে পশ্চিম মাথা-সাতমসজিদ রোড-বিজিবি ২ নম্বর গেট-ধানমন্ডি ৩ নম্বর রোড ইউটার্ন-সায়েন্স ল্যাব-বাটা সিগন্যাল (এলিফ্যান্ট রোড)-কাঁটাবন-নীলক্ষেত-পলাশী-আজিমপুর-নিউমার্কেটের মধ্যে। সর্বনিম্ন ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান, বিআরটিসি চেয়ারম্যান নিজে গিয়ে রুট দুটি উদ্বোধন করেন।
বিআরটিসির চক্রাকার বাসের এ রুট দুটি নভেল করোনাভাইরাসের কারণে ঘোষিত সাধারণ ছুটির (২৬ মার্চ) আগ পর্যন্ত চালু ছিল বলে সংস্থাটির কর্মকর্তারা দাবি করছেন, যা এখন পর্যন্ত বন্ধ আছে। তবে রুটের যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চালুর কয়েকদিন সবকিছু ঠিকমতো ছিল। দেড়-দুই মাসের মধ্যে চক্রের বাইরে চলতে শুরু করে চক্রাকার বাস। চক্রাকার রুট ছেড়ে ঢাকার জনপ্রিয় রুটগুলোতেই বেশি দেখা যেতে শুরু করে এসব বাস।
অন্যদিকে উত্তরায় চক্রাকার বাস সেবা চালু হয় গত ২৭ মে। অশোক লেল্যান্ডের ১০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস দিয়ে সেবাটির উদ্বোধন করেন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। চালুর কিছুদিন পর থেকেই উত্তরায় চক্রাকার বাস আর চক্রে চলছিল না। নির্ধারিত রুটের বাইরে চলাচল করায় যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়তে শুরু করেন। গত বছরের শেষ নাগাদ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এ চক্রাকার রুট।
ঢাকার যেকোনো রুটেই বাস পরিচালনা লাভজনক। বিআরটিসি যেসব রুটে চক্রাকার বাস চালু করেছিল, সেগুলোও ছিল মহানগরীর অন্যতম ব্যস্ততম রুট। লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও কেন এ চক্রাকার রুট বন্ধ করে দেয়া হলো—জানতে চাইলে বিআরটিসির জেনারেল ম্যানেজার (হিসাব) আমজাদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, উত্তরায় চক্রাকার বাসের যে রুটটি নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেখানে অবকাঠামোগত কিছু দুর্বলতা ছিল। সড়কগুলো ছিল তুলনামূলক অপ্রশস্ত। এ কারণে চাহিদা অনুযায়ী বাস কাউন্টার থেকে শুরু করে অন্যান্য কাঠামো সেখানে গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছিল না।
তবে ধানমন্ডির চক্রাকার বাসগুলো নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির আগ পর্যন্ত চালু ছিল বলে দাবি করে তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে এখনো সবকিছু স্বাভাবিক হয়নি। স্কুল-কলেজ বন্ধ রয়েছে। মানুষের যাতায়াতও তুলনামূলক কম। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ রুটও আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে মত দেন তিনি।
পরীক্ষামূলক হিসেবে চালু করা ঢাকার চক্রাকার বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। ডিএসসিসি মেয়র বাস রুট র্যাশনালাইজেশন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়কও। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এ কমিটির ১২তম সভায় ডিএসসিসি মেয়র বলেন, দুর্ভাগ্যবশত আগের ১১টি সভায় যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তার তেমন কিছুই বাস্তবায়ন করা হয়নি। ঢাকায় নতুন করে বাসের রুট পারমিট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যা মানা হয়নি। বিআরটিসি কিছু চক্রাকার বাস চালু করেছিল, যেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। আগামী ১০ নভেম্বর এ বিষয়ে আরেকটি সভা করা হবে। সেই সভায় বাস রুট র্যাশনালাইজেশন কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে সম্পর্কে প্রয়োজনীয় রূপরেখা আমরা তৈরি করব।










