স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টিতে জোর দেয়া হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়নে গৃহীত ২০ বছর মেয়াদি কৌশলপত্রেও। প্রতি বছর বাজেটে খাতটিতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে ঠিকই, তবে তা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার স্বাস্থ্য চাহিদার বিপরীতে অপ্রতুল। ফলে কৌশলপত্রে খাতটির যেসব প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো শেষ পর্যন্ত থেকেই যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্য ব্যয়ে সবার পেছনে বাংলাদেশ। এছাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার নানা প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অপর্যাপ্ত অর্থায়নের বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। যদিও স্বাস্থ্য খাতে সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে এরই মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়ন কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে।
২০১২-৩২ সাল মেয়াদি এ কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট। স্বাস্থ্য খাতে সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধি বাড়াতে প্রণীত এ কৌশলপত্রে খাতটির অর্থায়নে বেশকিছু প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরা হয়। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে সম্পদের স্বল্পতা, অর্থের বরাদ্দ ও ব্যবহারে অন্যায্যতা এবং বরাদ্দকৃত সম্পদের ব্যবহারে অদক্ষতা। এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে খাতটিতে বরাদ্দ বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে কৌশলপত্রে। সে অনুযায়ী প্রতি বছর বাজেটে অর্থ বরাদ্দ বাড়লেও শেষ পর্যন্ত তা অপ্রতুলই থেকে যাচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) বাজেটে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের জন্য বাজেট বরাদ্দ রয়েছে ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৮-১৯ ও ২০১৭-১৮—এই দুই অর্থবছরে এ বরাদ্দের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ২২ হাজার ৩৩৬ কোটি ও ২০ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুজাহেরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়নে বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। এর পরও এ বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। আবার এ বরাদ্দের একটি বড় অংশই ব্যয় হয় বেতন-ভাতা, অবকাঠামো ও বিভিন্ন ক্রয় প্রকল্পে। অবশিষ্টাংশ ব্যয় হয় স্বাস্থ্যসেবায়, যার পরিমাণ খুবই কম। আবার বরাদ্দকৃত অর্থের বড় একটি অংশ নষ্ট হয় অপচয় ও দুর্নীতিতে। ফলে সাধারণ জনগণ খুবই কম বরাদ্দ পায় স্বাস্থ্যসেবায়। যথেষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ না থাকায় চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণসহ নানা উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয় না। স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়ন কার্যকর করে তুলতে হলে আমাদের অগ্রাধিকারের জায়গাগুলো নির্দিষ্ট করতে হবে। সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়নে যে কৌশলপত্রটি রয়েছে সেটি মনিটরিং ও সুপারভাইজ করতে হবে, যাতে সাধারণ জনগণ স্বাস্থ্যসেবার সুফল ভোগ করতে পারে।
প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের পরিচালন ব্যয় ১০ হাজার ৭ কোটি টাকা ও উন্নয়ন ব্যয় ৯ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের পরিচালন ব্যয় ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা ও উন্নয়ন ব্যয় ২ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধি ও তার অধিকতর সুষম ব্যবহারের রূপরেখা নিশ্চিতে কৌশলপত্রটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অন্যান্য স্বাস্থ্য লক্ষ্য ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূূর্ণ। এসব নীতির মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হচ্ছে ২০১১-১৬ মেয়াদি স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচি (এইচটিএনএসডিপি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য কর্মসূচি, জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১১ ইত্যাদি। এসব নীতি ও কর্মসূচির প্রতিটিতেই স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের আয় ও আয়ুষ্কাল বাড়ার কারণে দেশে বার্ধক্যে পৌঁছানো লোকের সংখ্যা বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জটিল রোগে আক্রান্তদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যাও। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে মানসম্পন্ন প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। অন্যদিকে উচ্চব্যয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিপর্যয় ঘটছে দেশের গরিব ও দুস্থ শ্রেণীর জনসাধারণের জীবনযাত্রায়। এ নেতিবাচক ও বিপর্যয়মূলক প্রভাব হ্রাস করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য স্বাস্থ্যসেবাগ্রহীতার আর্থিক সুরক্ষা বাড়ানোও অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। মূলত স্বাস্থ্য খাতের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার উদ্দেশেই কৌশলপত্রটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
কৌশলপত্রে দেশের জনগণের সব অংশের আর্থিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এতে কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার অন্যতম হলো সব মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় মানসম্মত ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমও এ কৌশলপত্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া সেবা নিতে গিয়ে সেবাগ্রহীতারা যাতে কোনো ধরনের আর্থিক দৈন্যদশায় না পড়েন, সে বিষয়েও জোর দেয়া হয়েছে কৌশলপত্রে।









