চাঁদার দাবিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) একটি ভবনের নির্মাণ কাজে ভাঙচুর ও শ্রমিক মারধরের অভিযোগ উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কেএম নুর আহমদ বরাবর নিরাপত্তা চেয়ে চিঠিও দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ ঘটনার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স অনুষদ ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

ভবনটির নির্মাণ কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইয়াকুব এন্ড ব্রাদার্সের পরিচালক নাঈম উল ইসলামের অভিযোগ, গত ২১ জুন দুপুর ১টা ২০ মিনিটে ছাত্রলীগ পরিচয়ে পাঁচ যুবক নির্মাণকাজে এসে হুমকি দিয়েছিল। তাদের সাথে আলোচনার না করা পর্যন্ত নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে বলেন। পরদিন ২২ জুন রাত ৮টা ১৫ মিনিট তারা আবার আসে। এসময় সাইট অফিস ভাঙচুর ও শ্রমিকদের মারধর করে চলে যায়। ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় শ্রমিকরা মঙ্গলবার নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখেছেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে।

এদিকে ঘটনার বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থির চিত্র বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, সোমবার রাত ৮টা ২৭ মিনিটের দিকে মেরিন সায়েন্স অনুষদে নির্মাণ প্রকল্পে ১০ জন যুবক প্রবেশ করেন। এসময় তাদের মধ্যে থ্রি কোয়ার্টার পড়া এক যুবককে ভেতরে থাকা কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। অন্য আরেকটি ফুটেজে দেখা যায়, সাদা শার্ট ও জিন্স প্যান্ট পড়া একজনের হাতে লোহার রড ছিল। পরে মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে তিনটি বাইকে করে ফের নির্মাণাধীন প্রকল্পে আসেন সাত যুবক। এসময় বাইক থেকে নেমে এক যুবক প্রকল্পের ফটকে লাথি মারতে দেখা যায়। ওই সময় তারা বাইক নিয়ে চলে যান।  

সিসিটিভি ফুটেজ ও স্থিরচিত্র দেখে ‘ভাঙচুরের ঘটনায়’ অংশ নেয়া ১০ জনের মধ্যে পাঁচ জনের পরিচয় জানা গেছে; যারা সবাই শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা। তারা হলেন- শাখা ছাত্রলীগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মনছুর আলম, সাবেক সহসভাপতি আল-আমিন রিমন, আবদুল মালেক ও নাসির উদ্দিন সুমন এবং ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ চক্রবর্তী দুর্জয়। এদের মধ্যে মনছুর, মালেক ও দুর্জয় সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত এবং রিমন ও সুমন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাদের কারোরই ছাত্রত্ব না থাকলেও করোনা মহামারীর বন্ধে গত তিন মাস ধরে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে ক্যাম্পাসে অবস্থান করছেন তারা। এছাড়া এই সংকটে শাখা ছাত্রলীগ গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেও গেছে তাদের। 

অভিযোগের বিষয়ে ভিন্নভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে অভিযুক্তদের কাছ থেকে। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মনছুর আলম বলেন, ‌‘আমরা জানতে পেরেছি সেখানে মাদকের আড্ডা বসে। তাই আমরা সেটি দেখতে যাই। গিয়ে দেখানে সেখানে দুইজন করোনা আক্রান্ত রোগী রয়েছেন এবং তারা কাজ করতে গিয়ে কোনো প্রকার স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। আমরা তাদেরকে যখন মাদকের কথা বলি তখন তাদের দুজন দৌড় দেয়। কিন্তু কারও গায়ে হাত তোলা হয়নি।’ করোনা আক্রান্ত কীভাবে নিশ্চিত হলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উপসর্গ দেখে বুঝেছি তারা করোনা আক্রান্ত।’

তবে অভিযুক্ত আবদুল মালেক বলেন, ‘বিকেলে হাঁটতে বের হয়ে আমরা ওই দিকটায় যাই। যেহেতু নতুন একটি ভবন হচ্ছে তাই কৌতুহলবশত কাজ কেমন চলছে বা ডিজাইন কেমন হচ্ছে সেটি দেখতে ভেতরে ঢুকি। কারও সাথে কোন খারাপ ব্যবহার করা হয়নি। যে অভিযোগ আনা হচ্ছে সেটি ভিত্তিহীন।’

আরেক অভিযুক্ত প্রদীপ চক্রবর্তী দুর্জয় বলেন, ‘আমরা শুনেছি মেরিন সায়েন্সের ভবন নির্মাণে নিম্নমানের ইট-বালি ব্যবহার করা হচ্ছে। সেটা তদারকি করতেই আমরা গিয়েছিলাম। বিষয়টি আমরা একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে অবহিত করেছি।’

বাকি দুজন নাছির উদ্দিন সুমন ও আল-আমিন রিমনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে এ ঘটনার দায়ভার সংগঠন নেবে না বলে জানিয়েছেন চবি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু। তারা বলছেন, ‘ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির সাথে যুক্ত কেউই ছাত্রলীগ দাবি করার সুযোগ নেই। অভিযোগ ও তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে।’

এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এসএম মনিরুল হাসান বলেন, ‘আমরা ঘটনাটি শুনেছি। সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’