কার্যক্রম শুরুর এক বছর পূর্ণ করেছে ইউনিকো হসপিটালস। প্রথম বছরের এ যাত্রাকে কীভাবে দেখছেন?

প্রথম বছরটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ঘটনাবহুল ছিল। আমরা প্রতি মাসেই একটু একটু করে বেড়ে উঠেছি। নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখেছি। আমাদের রোগীদের নির্দিষ্ট কিছু প্রত্যাশা ছিল, আশা করি আমরা তা পূরণ করতে পেরেছি।

আমাদের হাসপাতালটি ঢাকা শহরের হেলথ হাব বা স্বাস্থ্যসেবার প্রাণকেন্দ্র গ্রিন রোডে অবস্থিত। চারপাশে অনেক হাসপাতাল থাকার পরও মাত্র এক বছরে মানুষ আমাদের আলাদা করে চিনতে পেরেছে। আমাদের ওপর আস্থা রেখেছে, যা দিনে দিনে আরো বাড়ছে। গত এক বছরে ১০ হাজারের বেশি মানুষ আমাদের এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে এসেছে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো রোগীরা যখন হাসপাতাল ছাড়বেন, তখন যেন তারা আসার সময়ের চেয়ে অনেক বেশি খুশি এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। এটাকেই সব থেকে বড় অর্জন মনে করি আমরা।

রোগীদের পক্ষ থেকে কেমন সাড়া পেয়েছেন, বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে আপনারা কী কী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন?

রোগীরা যখন শোনেন যে এখানে ইন্ডিয়ান ম্যানেজমেন্ট জড়িত, তারা অনেক সময় ধরে নেন বিদেশী চিকিৎসক আছেন। কিন্তু সত্যিটা হলো শুধু টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট হিসেবে কেরালার রাজগিরি হাসপাতাল এখানকার ডিজাইন, প্ল্যানিং ও ইকুইপমেন্টের কাজ করছে। এছাড়া আমাদের লিডারশিপ টিমের কয়েকজন সদস্য যেমন আমি এবং ওটি ম্যানেজার কেরালা থেকে এসেছি। এছাড়া আমাদের পুরো মেডিকেল টিম বাংলাদেশী। আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি আমাদের বাংলাদেশী ডাক্তাররা অত্যন্ত দক্ষ এবং রোগীদের প্রতি দায়বদ্ধ।

বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় শিখেছি যে ঢাকার স্বাস্থ্য খাত রোগীতে ভরপুর। অনেক হাসপাতালে চিকিৎসকরা রোগীদের কথা শোনার সময় পান না। কিন্তু রোগীদের জন্য সময়, রোগীদের প্রয়োজনমাফিক মনোযোগই আমাদের অগ্রাধিকার। সেজন্য আমরা চিকিৎসকদের উৎসাহিত করি। রোগীরা এতে অবাক ও আনন্দিত হন। এছাড়া আরেকটি ভালো অভিজ্ঞতা হলো রোগীরা প্রায়ই বলেন যে তারা অন্য কোথাও হাউজকিপিং স্টাফদের হাসিমুখে থাকতে দেখেননি, কিন্তু আমাদের স্টাফরা হাসিমুখে তাদের সম্ভাষণ জানায়। এটিই সেই সংস্কৃতি যা আমরা আলাদাভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে আপনি কোন মাইলফলক নিয়ে সবচেয়ে বেশি গর্বিত?

আমার টিমই আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ। ক্লিনিক্যাল টিম থেকে শুরু করে টেকনিক্যাল টিম, নার্সিং টিম কিংবা ম্যানেজমেন্ট (ফাইন্যান্স, এইচআর, সাপ্লাই চেইন) টিম। আমরা যে দক্ষ জনবল তৈরি করতে পেরেছি, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। চিকিৎসক একাই সেরা সেবা দিতে পারেন না; তিনি হয়তো ক্লিনিক্যাল দিকে খুব ভালো হতে পারেন, কিন্তু রোগীর পুরো জার্নিটিকে স্মরণীয় ও সুন্দর করে তোলার জন্য নার্স এবং পুরো সিস্টেমকেও সমানভাবে দক্ষ হতে হয়। আমরা নিজেদের একটি ‘ফ্যামিলি অব কেয়ারগিভারস’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

বর্তমানে ইউনিকো হসপিটালসে প্রধানত কী কী চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাচ্ছে?

বর্তমানে বেশকিছু উচ্চমানের এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা চালু আছে। যেমন, আমরা আমাদের প্রথম বছর থেকেই ‘মিনিমালি ইনভেসিভ কার্ডিয়াক সার্জারি’ পরিচালনা করছি। সাধারণ হার্ট সার্জারির মতো বুক পুরোটা না কেটে এখানে মাত্র ২ থেকে ৩ ইঞ্চির ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়। এর পাশাপাশি শিশুদের হার্টের জন্মগত ত্রুটি যেমন, এএসডি এবং ভিএসডি সংশোধনের কাজও আমরা নিয়মিতভাবে করছি। আমাদের কার্ডিওলজি বিভাগে ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজির মাধ্যমে ইন্ট্রাভাসকুলার আল্ট্রাসাউন্ড এবং ইন্ট্রাভাসকুলার লিথোট্রিপসির মতো অত্যন্ত আধুনিক ও বিরল পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে খুব কম হাসপাতালেই ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজি বিভাগটি আছে, যা আমাদের এখানে সক্রিয়। এর মাধ্যমে আমরা বেশ জটিল সব নিউরো প্রসিডিউর সম্পন্ন করছি। এছাড়া আমাদের রেডিওলজি বিভাগ আমাদের অন্যতম বড় শক্তি। আমাদের এখানে ‘১২৮-স্লাইস’ সিটি স্ক্যানার রয়েছে, যা পুরো এশিয়াতেই আমাদের প্রথম ছিল। এছাড়া আমাদের ক্যাথ ল্যাব এবং এমআরআই মেশিনেও আমরা ফিলিপসের মতো বিশ্বসেরা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। হাসপাতালের অবকাঠামো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে আমাদের প্রতিটি সাধারণ রুম বা কেবিনেই অক্সিজেন, এয়ার এবং মেডিকেল গ্যাসের সুবিধা আছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে আমরা যেকোনো সাধারণ রুমকেও একটি পূর্ণাঙ্গ আইসিইউতে রূপান্তর করতে পারি।

আমাদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সেবা হলো ‘ইউনিকো হোম কেয়ার’। এটি অন্যান্য হাসপাতালের মতো সাধারণ রক্ত সংগ্রহ বা ওষুধ পৌঁছে দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আমাদের একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্যামিলি মেডিসিন টিম আছে, যেখানে চিকিৎসক, নার্স এবং প্রয়োজনে ফিজিওথেরাপিস্টও রোগীর বাড়িতে যান। বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তি বা যারা হাসপাতালে আসতে সমস্যায় পড়েন, তাদের নিয়মিত চেকআপের জন্য এ সেবাটি ডিজাইন করা হয়েছে। এর বাইরেও আমাদের টেলিমেডিসিন সুবিধা তো রয়েছেই।

ইউনিকো হসপিটালসের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

আমরা বর্তমানে ২৫০ বেড থেকে ৫০০ বেডের হাসপাতালে উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছি। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো একটি ‘নার্সিং কলেজ’ এবং নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা। আমরা মনে করি তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে সরাসরি রোগীর পরিচর্যা বা বেডসাইড নার্সিংয়ে উন্নতির অনেক সুযোগ আছে। আমাদের একাডেমি দক্ষ নার্স তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে ‘ইউনিকো হোম কেয়ার’ সার্ভিসটিকে আমরা আরো বড় করতে চাই। শিগগিরই ‘ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজি’ বিভাগটি চালু করতে চাই। এছাড়া চলতি বছরেই জেসিআই, এসিআই অথবা এসিএসআইয়ের মতো আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতির বা অ্যাক্রেডিটেশনের জন্য আবেদন করার পরিকল্পনা নিয়েছি।

আপনারা কি কোনো আন্তর্জাতিক মান বা ক্লিনিক্যাল প্রটোকল অনুসরণ করেন?

আমাদের কনসালট্যান্ট রাজগিরি হাসপাতালটি জেসিআই স্বীকৃত। আমি নিজেও জেসিআই (আমেরিকান) এবং এসিএসআই (অস্ট্রেলিয়ান) স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। ইউনিকোর পুরো লে-আউট পরিকল্পনা এবং ডিজিটাল প্রক্রিয়া (যেমন পেশেন্ট পোর্টাল যেখানে রোগী তার সব রিপোর্ট পান) এসব আন্তর্জাতিক মানের কথা মাথায় রেখেই করা হয়েছে।

এছাড়া রোগীদের ও কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য আমরা ‘ইনফেকশন কন্ট্রোল প্রটোকল’ কঠোরভাবে মেনে চলি। আমাদের ইনফেকশন কন্ট্রোল টিমের নেতৃত্বে আছেন একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং একজন স্পেশালিস্ট নার্স। তারা হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে প্রতিটি বিভাগের পরিচ্ছন্নতা তদারকি করেন। আমরা পিপিই এবং হ্যান্ড হাইজিন প্রটোকল কঠোরভাবে মেনে চলি। এছাড়া আমরা রোগীদের সচেতন করার জন্য রুমে পোস্টার দিয়েছি, যাতে তারা খেয়াল করতে পারেন নার্স তাদের সেবার আগে হাত স্যানিটাইজ করছেন কিনা বা গ্লাভস পরছেন কিনা।

ইউনিকো হসপিটালস অন্যদের থেকে কেন আলাদা?

আমাদের মূল ফোকাস ‘সার্ভিস এলিমেন্ট’ এবং প্রতিনিয়ত ইন-হাউজ ট্রেনিং। এই এক বছরে আমরা এরই মধ্যে দুটি আন্তর্জাতিক নার্সিং ওয়ার্কশপ এবং রেডিওলজি ও ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্টদের জন্য জাতীয় পর্যায়ের ওয়ার্কশপ আয়োজন করেছি। চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিনিয়ত আধুনিক হচ্ছে, আমাদের জনবলকেও সেই অনুযায়ী দক্ষ রাখতে হবে। আমরা রোগীদের সেই ‘ওয়াও ফ্যাক্টর’ দিতে চাই, যা তারা সিঙ্গাপুরে গিয়ে খোঁজেন, যেমন পরিষ্কার করিডোর, পরিষ্কার টয়লেট এবং হাসিখুশি স্টাফ।

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে, বিশেষ করে ভারতে যান। এ প্রবণতা কমাতে আপনারা কীভাবে ভূমিকা রাখছেন?

মানুষ বিদেশে যান একটি নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত পরিবেশের খোঁজে। আমরা সেই বিশ্বাসটিই এখানে তৈরি করছি। আমাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যেমন ১২৮-স্লাইস সিটি স্ক্যানার যখন আমরা কিনি, তখন এটি এশিয়ায় প্রথম ছিল। ক্লিনিক্যাল দক্ষতার দিক থেকে আমাদের চিকিৎসকরা কোনো অংশেই আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে পিছিয়ে নেই। মূল পার্থক্যটা হয় সেবার ক্ষেত্রে, তাই আমরা সেবার মান ও আচরণের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছি, যাতে রোগীরা দেশেই বিদেশের মতো সেবা অনুভব করেন।

চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণের জন্য আপনারা কী করেন?

প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন আমাদের অন্যতম মূল লক্ষ্য। এটি চিকিৎসক, নার্স বা টেকনিক্যাল স্টাফ—সবার জন্যই বাধ্যতামূলক। বর্তমানে আমাদের পাঁচ শতাধিক সদস্যের টিম রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ১০০ জন চিকিৎসক। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের চিকিৎসক ও নার্সদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আমরা ওয়ার্কশপ আয়োজন করি, আবার আমাদের চিকিৎসকদের বিদেশে প্রশিক্ষণে যাওয়ার ক্ষেত্রেও উৎসাহিত করি। এছাড়া আমরা রোগ প্রতিরোধমূলক সচেতনতা নিয়ে কাজ করি।

আন্তর্জাতিক বা ভারতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপনাদের কর্মীদের জ্ঞান বিনিময়ের কোনো ব্যবস্থা আছে?

২০২২ সাল থেকেই রাজগিরি হাসপাতালের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত জ্ঞান বিনিময় চলছে। আমাদের নার্সিং লিডার এবং এফএনবি ম্যানেজারদের সেখানে এক মাসের ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছিল। আবার রাজগিরির নার্সিং লিডারশিপ টিম এক বছর এখানে থেকে আমাদের নার্সদের হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ভিসা প্রক্রিয়া এখন সহজ হওয়ায় আমরা আরো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে ভারতে ট্রেনিংয়ে পাঠানো এবং ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের এখানে এনে আমাদের টিমকে শিক্ষিত করার পরিকল্পনা করছি।