ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগ মূলত কী কী বিষয় নিয়ে কাজ করে?
এক কথায় বললে, আত্মপরিচয়ের সংস্কৃতি বা দৃশ্য সংস্কৃতি নিয়েই এ বিভাগ কাজ করে। তবে এখানে ‘প্রাচ্য’ ধারণাটিকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। প্রাচ্য ধারণার উৎপত্তি, এর রাজনৈতিক তাৎপর্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিভাগের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস—এসব প্রশ্নও আমাদের অধ্যয়নের অংশ। এই প্রশ্নগুলো বাদ দিয়ে প্রাচ্যকলা বিভাগকে বোঝা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আমাদের ভাবতে হচ্ছে, নিজস্ব শিল্পের ধারণাকে বর্তমান সময়ে কীভাবে এবং কেন নতুন করে দেখা প্রয়োজন।
চারুকলার প্রতি আপনার আগ্রহ তৈরি হলো কীভাবে? এই পথে আসার পেছনে কারা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন?
আমাদের সমাজে চারুকলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এক ধরনের রাজনীতি রয়েছে। নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজে শিল্পকে কীভাবে দেখা হয়, কোন বিষয়কে গ্রহণ করা হয়, কোনটিকে করা হয় না—সেটি গুরুত্বপূর্ণ। আমার পরিবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ছবি আঁকায় আপত্তি ছিল না, কিন্তু চারুকলায় পড়তে চাওয়াটা তারা সমর্থন করেনি।
এ অভিজ্ঞতা শুধু আমার নয়। আমার পূর্বসূরি ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখি। ফলে চারুকলায় ভর্তি হওয়াটাই অনেকের জন্য এক ধরনের বিদ্রোহ। তবে প্রতিরোধ শুধু পরিবারকে অতিক্রম করে চারুকলায় ভর্তি হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিন শ্রেণীকক্ষে প্রবেশ করা, শিল্পচর্চা চালিয়ে যাওয়া এবং সমাজে নিজের কাজের জায়গা তৈরি করাও এক ধরনের প্রতিরোধ। কারণ আমাদের সমাজে শিল্পচর্চার প্রতি প্রত্যাশিত স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন নেই।
বিশ্বজুড়ে শিল্পের বাজার, গ্যালারি ও নিলামের বড় পরিসর রয়েছে। অনেক শিল্পীও ভালো আয় করেন। বাংলাদেশে শিল্প কেন সবার জন্য নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় পেশা হয়ে উঠতে পারছে না?
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক কাঠামোর অংশ। রাষ্ট্র কতটা শিল্প ও সংস্কৃতিবান্ধব, পুঁজির বিকাশ কীভাবে হচ্ছে এবং পুঁজিপতিরা সংস্কৃতিকে কীভাবে দেখছেন—এসবের সঙ্গে শিল্পের বাজার সরাসরি সম্পর্কিত। শিল্পের বাজার বুঝতে হলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও শিল্পব্যবস্থাকেও বুঝতে হবে।
‘বৈশ্বিক’ শিল্পবাজার বলতেও একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। যেমন ল্যুভর জাদুঘরকে শিল্পের মক্কা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন মানুষ কেন প্যারিসে গিয়ে মোনালিসা দেখার জন্য অর্থ ব্যয় করতে আগ্রহী হন, অথচ নিজের দেশের জাতীয় জাদুঘরে গিয়ে জয়নুল আবেদিনের কাজ দেখেন না? এটি শুধু শিল্পকর্মের নান্দনিকতার প্রশ্ন নয়; মানুষের মনোজগতে তৈরি হওয়া সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ধারণারও বিষয়।
তাই কার শিল্পকর্মের দাম কত হবে, কোন শিল্পী আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন, তা নির্ধারণে রাষ্ট্র ও পুঁজিবাজারের ভূমিকা রয়েছে। সেখানে একটি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানও প্রভাব ফেলে। আপনি বৈশ্বিক শিল্পবাজারে কেবল ভোক্তা, নাকি নিজের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রামীণ জীবনে মাটির ঘরের দেয়ালে লেপ দেয়ার মধ্যেও এক ধরনের শিল্পচর্চা রয়েছে। এ ধরনের লোকজ শিল্পকে একাডেমিক শিক্ষা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বাধা কোথায়?
বাধা মূলত আমাদের অর্থনৈতিক শ্রেণীবিভাজন, যেটি আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বজায় রাখছি, কিন্তু স্বীকার করতে চাই না।
একজন গ্রামীণ মানুষ যখন মাটির ঘরের দেয়াল লেপেন, তখন তিনি আমার মতো করে ঘোষণা দেন না যে এটি শিল্পের জন্য শিল্প, সৌন্দর্যের জন্য সৌন্দর্য কিংবা কোনো উদ্দেশ্যহীন সৃজনশীল কাজ। তার উদ্দেশ্য প্রথমত ঘর পরিষ্কার রাখা। কিন্তু কাজটি করতে গিয়ে মাটির সঙ্গে তার সম্পর্ক, জীবনযাপন ও মনোজগতের প্রকাশ ঘটে। তিনি এর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে যুক্ত হন। সেখানে বাইরের কোনো চাপ বা আরোপিত ধারণা নেই।
কিন্তু দূর থেকে এসে আমি যখন তার কাজকে শিল্প হিসেবে সংজ্ঞায়িত করি, তখন একটি শ্রেণীগত অবস্থান তৈরি হয়। আমরা বলি, আমারটি চারুকলা, তারটি কারুকলা। অথচ যিনি কাজটি করছেন, তিনি হয়তো চারুকলা বা কারুকলা—কোনোটির পরিভাষাই জানেন না। তিনি নিজের জীবন ও প্রয়োজনের মধ্য দিয়ে কাজটি করছেন।
শিল্পের একাডেমিক চর্চায় আমরা অনেক সময় প্রথমেই শিক্ষার্থীকে তার নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। একদিকে প্রাচ্যকলা বা নিজস্ব শিল্পের ইতিহাস পড়াই, অন্যদিকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাই তৈরি করছে বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় এ বিচ্ছিন্নতা কীভাবে তৈরি হচ্ছে?
জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষকের সন্তানদের আসার কথা বলেছিলেন, যারা ধান বিক্রি করে পড়াশোনার জন্য টাকা নিয়ে আসত। পরবর্তী সময়ে তিনি দেখেছেন, শিক্ষিত ও পেশাজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কৃষি ও গ্রামের সম্পর্কও ক্রমে বদলে যাচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন শ্রেণী থেকে কত শতাংশ শিক্ষার্থী আসছে? তারা কি এখানে জ্ঞান উৎপাদন করতে আসে, যে জ্ঞানের মধ্য দিয়ে নিজের গ্রাম, শহর ও সমাজকে নির্মাণ করবে? নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর তাদের প্রধান আকাঙ্ক্ষা হয়ে ওঠে শহরে স্থায়ী হওয়া, সুযোগ পেলে বিদেশে চলে যাওয়া?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক অবদান অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে দেখলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার সঙ্গে বৃহত্তর সমাজের বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নটি সামনে আসে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যে বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতির কথা বলেছেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তার প্রতিফলন দেখা যায়।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও এসএম সুলতানের মতো মানুষের কাছাকাছি থাকা শিল্পী এখন আর তৈরি হচ্ছেন না বলে মনে হয়। তাদের উত্তরাধিকার আমরা কতটা ধারণ করতে পারছি?
প্রথমে প্রশ্ন করা প্রয়োজন, এসএম সুলতান কেন গুরুত্বপূর্ণ? তাঁর গুরুত্ব কি আমরা যথাযথভাবে বুঝি, নাকি তার ওপর কিছু ধারণা আরোপ করি?
জয়নুল আবেদিনের অবদান বস্তুগতভাবে দেখানো সম্ভব। তিনি চারুকলা শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন, সোনারগাঁওয়ে লোকশিল্প জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে তার প্রসঙ্গ এলে আমরা শিল্পীসত্তার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ইতিহাসও আলোচনা করি।
এসএম সুলতান দৃশ্যমান অর্থে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেননি। তাহলে তার গুরুত্ব কোথায়? তাঁকে বোঝার জন্য আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি, শ্রেণীগত অবস্থান এবং দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে।
চারুকলায় পড়তে এসে প্রথম যখন সুলতানের সঙ্গে পরিচিত হই, তখন তার সম্পর্কে নানা গল্প শুনেছি। কিন্তু গল্পগুলোর শেষে প্রায়ই এক ধরনের হাসি বা বিদ্রূপ থাকত। কেন একজন শিল্পীকে নিয়ে এভাবে কথা বলা হয়, সেটি আমাকে ভাবিয়েছে। নাগরিক কাঠামোয় বেড়ে ওঠা মানুষ, তাদের জেন্ডার ও সামাজিক পরিচয় সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা এবং শ্রেণীগত অবস্থান থেকে আমরা সুলতানকে কীভাবে দেখি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তার জীবদ্দশায় তাকে আমরা কীভাবে সম্মান করেছি, সেটিও প্রশ্ন। এখন তাকে নিয়ে প্রশ্ন করতেও যেন আমরা অস্বস্তি বোধ করি। একদিকে তাকে গ্রহণ করি, অন্যদিকে তাকে একটি নির্দিষ্ট বাইনারির মধ্যে আটকে রাখি। ফলে তার শিল্পের মধ্য দিয়ে তিনি কী ধরনের জ্ঞান উৎপাদন করেছেন, সেটি বোঝার সুযোগ তৈরি হয় না। পরবর্তী প্রজন্ম তখন তার বাহ্যিক জীবনযাপন বা চেহারার অনুকরণ করতে পারে, কিন্তু তার শিল্পের জ্ঞান ও দর্শন থেকে শিক্ষা নিতে পারে না।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় চারু ও কারুকলার গুরুত্ব কতটা? স্কুল পর্যায়ে শিল্পশিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে?
এর প্রভাব বুঝতে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের সন্তানরা প্রতিদিন স্কুল ও শহরের জীবন থেকে ফিরে কতটা উচ্ছল থাকে, নাকি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে, সেটি দেখলেই অনেক কিছু বোঝা যায়। আমাদের মনোজগৎ কতটা ট্রমাটাইজড, সেটি উপলব্ধি করা জরুরি। এই পরিস্থিতি সামলানোর সঙ্গে সৃজনশীল ও সুকুমার বৃত্তির সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু আমরা শিশুর বিকাশকে নম্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত করে ফেলেছি। একটি শিশু কতটা মানবিক হচ্ছে, তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ কতটা ঘটছে, পৃথিবী ও অন্য মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানের ধারণা কতটা তৈরি হচ্ছে—এসব বিবেচনায় নিচ্ছি না। আমরা দেখছি কত নম্বর পেল, কত শতাংশ পাস করল।
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার পর রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমে পাসের হার নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা পাঠ্যক্রম থেকে কতটা জ্ঞান অর্জন করেছে, তাদের সৃজনশীলতা কতটা বিকশিত হয়েছে কিংবা প্রশ্নপত্রে চিন্তার স্বাধীনতার সুযোগ কতটা ছিল, এসব নিয়ে তেমন বিশ্লেষণ দেখি না।
একসময় পঞ্চম শ্রেণীর সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হতো। অভিভাবকরা ছোট শিশুদের জন্য প্রশ্নপত্র কিনে দিতেন। যে শিশুদের এভাবে বড় করা হচ্ছে, তারা নিজের সঙ্গে কতটা স্বস্তিতে থাকতে পারছে, অন্য মানুষের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক তৈরি করবে—সেটি বড় প্রশ্ন। শিল্পশিক্ষা শিশুর মনোজগৎ ও সৃজনশীল বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একে শুধু পরীক্ষার নম্বরের বিবেচনায় দেখলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্যই হারিয়ে যায়।
প্রাচ্যের অন্যান্য দেশে শিল্পচর্চা ও শিল্পের বাজার কীভাবে বিকশিত হচ্ছে?
প্রথমে ‘প্রাচ্য’ ধারণাটিই প্রশ্নের মুখে ফেলা দরকার। প্রাচীন রোমান সভ্যতার বিপরীতে একটি রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইউরোপে প্রাচ্যের ধারণা বিকশিত হয়েছে। আমরা যতক্ষণ সেই ধারণা বহন করব, ততক্ষণ নিজের জীবন ও প্রয়োজনকে সামনে রেখে চিন্তা করতে পারব না। বরং অন্যের ধারণা অনুসরণ করে বুঝতে চাইব, আমাদের কী করা উচিত।
আমাদের বিভাগটির যাত্রা শুরু ১৯৫৫ সালে। পৃথিবীর অনেক দেশে এ ধরনের বিভাগ নেই; কোথাও কোথাও পুরনো নামটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অংশ হিসেবে টিকে আছে। অনেক দেশে এখন সাউথ এশিয়ান বা এশিয়ান স্টাডিজের মতো কাঠামোয় এসব বিষয় পড়ানো হয়। আমাদের এখানে ওরিয়েন্টাল নামটি রয়ে গেছে, যা জয়নুল আবেদিন চালু করেছিলেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, চীন কি ওরিয়েন্টাল ধারণার অধীনে নিজের শিল্প ও সংস্কৃতির প্রয়োজন নির্ধারণ করে? নাকি নিজের সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী শিল্পকে বিবেচনা করে? মানুষের যেমন অর্থনৈতিক শ্রেণী ও দক্ষতার বিভাজন রয়েছে, শিল্পের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরন ও দক্ষতার ভিত্তিতে সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
আমাদের সমস্যা হলো পুরনো ধারণা আমাদের পিছু ছাড়ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগেরই নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন—কেন বিভাগটি থাকবে, কী জ্ঞান উৎপাদন করবে এবং তার পাঠ্যক্রম কেমন হওয়া উচিত। তবে তার আগে রাষ্ট্রকে পরিষ্কার করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় কেন প্রয়োজন এবং জনগণের অর্থে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্র কী প্রত্যাশা করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জাদুঘর, শিল্পকলা একাডেমি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
আমার বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষে জাতীয় জাদুঘরে যাওয়ার কথা। সেখানে প্রাচীন ভাস্কর্য গ্যালারি রয়েছে, যার সঙ্গে আমাদের বিভাগের সরাসরি সম্পর্ক আছে। শিক্ষার্থীদের সেখানে ইন্টার্নশিপ ও গবেষণার সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু জাতীয় জাদুঘরের সঙ্গে আমাদের কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই।
একবার শিক্ষার্থীদের নিয়ে জাদুঘরে ক্লাস নিতে গেলে প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন মহাপরিচালক প্রশ্ন করেছিলেন, সেখানে ক্লাস নেয়ার প্রয়োজন কী। আমি তাকে বলেছিলাম, চারুকলার পাশে জাতীয় জাদুঘর থাকার পরও যদি এ দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পর্ক না থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা এসব সংগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা করবে কোথায়?
জাদুঘরের বস্তুগুলো শুধু পুরনো খাট, মূর্তি বা পাণ্ডুলিপি নয়। এগুলোর মধ্যে ইতিহাস ও জ্ঞান সংরক্ষিত আছে। পরবর্তী প্রজন্ম সেগুলো নিয়ে গবেষণা করে নতুন জ্ঞান উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু আমাদের জাদুঘরগুলোর কার্যক্রম অনেকটাই টিকিট বিক্রি ও দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সংগ্রহের গবেষণা ও জ্ঞানগত অনুসন্ধানে যথেষ্ট গুরুত্ব দেখা যায় না।
বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন রয়েছে। সোনারগাঁওয়ের এ প্রতিষ্ঠান কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটি ভেবে দেখা প্রয়োজন। সেখানে দর্শনার্থী আসছেন, টিকিট বিক্রি হচ্ছে, অর্থ সংগ্রহ হচ্ছে। কিন্তু লোকশিল্পের ইতিহাস, বস্তুগত সংস্কৃতি ও গণমানুষের জীবনযাপন নিয়ে কতটা গবেষণা হচ্ছে?
লোকশিল্পকে শুধু প্রদর্শনযোগ্য বস্তু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি জনগোষ্ঠীর দৃশ্য সংস্কৃতি, মৌখিক সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ। যে জনগোষ্ঠীর অতীতের বস্তুগত নিদর্শন সেখানে সংরক্ষিত আছে, সেই জনগোষ্ঠী তো এখনো জীবিত। তাদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।
এখানে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের সঙ্গে গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণে নিজস্ব জ্ঞান ও গবেষণার প্রয়োজন অনুভূত না হলে এসব প্রতিষ্ঠানও সক্রিয় হবে না। এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে।
দেশের গ্যালারি ও প্রদর্শনীর পরিস্থিতি কেমন?
যতটুকু গ্যালারি রয়েছে, সেটিও এক অর্থে সৌভাগ্যের বিষয়। কয়েকটি গ্যালারি তরুণ শিল্পী ও নতুন চিন্তাকে উৎসাহিত করছে। কিন্তু এগুলোর বেশির ভাগই ব্যক্তিগত বা কয়েকজনের উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। এক ধরনের স্বেচ্ছাসেবামূলক প্রচেষ্টার ওপর এগুলো নির্ভরশীল।
অন্যদিকে জেলা পর্যায়ের শিল্পকলা একাডেমিগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। অনেক ভবন পরিত্যক্ত হয়ে যাচ্ছে। শিশু একাডেমির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখা যায়। একটি জেলায় শিল্পকলা একাডেমি বা শিশু একাডেমির ভবন যখন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে, তখন সেটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক অগ্রাধিকার এবং শিশুদের প্রতি মনোযোগের চিত্রও তুলে ধরে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমিগুলো সক্রিয় থাকলে ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্পচর্চার বাইরে একটি বিস্তৃত পরিসর তৈরি হতো। ভোলা বা বরিশালের কোনো তরুণ শিল্পী সেখানে কাজ প্রদর্শন করতে পারতেন। ঢাকার শিল্পী ও দর্শকরাও জেলার প্রদর্শনী দেখতে যেতেন। শিল্পের বিকাশ তখন শুধু রাজধানীর কয়েকটি গ্যালারির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না। শিল্পকলা একাডেমি ও শিশু একাডেমি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের শিল্পীরা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের বৈশ্বিক পর্যায়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে?
বর্তমান সময়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজেকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে। যাঁরা মেধাবী, সুযোগ বুঝতে পারেন এবং নিজেদের মতো করে কাজ করেন, তাঁরা শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে সহযোগিতা পেতে পারেন। এভাবে কিছু শিল্পী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের পরিচিত করছেন।
তবে তাঁদের ব্যক্তিগত সাফল্যের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠান কতটা নিতে পারে, সেটি প্রশ্ন। বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পচর্চায় ‘বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট’ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর সঙ্গে যুক্ত তৈয়বা বেগম লিপি ও মাহবুবুর রহমানের মতো শিল্পীদের আন্তর্জাতিক পরিচিতি রয়েছে।
কিন্তু তাঁদের এই যাত্রা প্রাতিষ্ঠানিক একাডেমিক উদ্যোগের ফল নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের মতো শিল্পীদের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়ের উদ্যোগ নিতে পারত। ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো, সমকালীন শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতা শ্রেণীকক্ষে নিয়ে আসা—এসব সম্ভব ছিল। কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠানে জ্ঞান ভাগাভাগির সংস্কৃতি নেই।
এখনকার শিক্ষার্থীরা যে ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে বের হচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে তা নিয়ে বড় সংকটে পড়তে পারে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শুধু নকল করে বা প্রযুক্তির সামান্য ব্যবহার করে পাস করার কোনো মূল্য থাকবে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে প্রতিবছর বের হওয়া তরুণদের সংকট আরও বাড়বে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পচর্চা ও শিল্পশিক্ষার ভবিষ্যৎকে কীভাবে প্রভাবিত করবে? এ বিষয়ে আপনাদের প্রস্তুতি কী?
আমি ব্যক্তিগতভাবে এআই ব্যবহারের সুযোগ উন্মুক্ত রাখার পক্ষে, এমনকি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও। শিক্ষার্থীকে যদি নির্দিষ্ট কোনো বিষয়, বস্তু বা পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করতে পাঠানো হয়, তাহলে সে এআইয়ের সহায়তা ছাড়াও নিজের পর্যবেক্ষণ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে কাজ করতে পারবে। কিন্তু শ্রেণীকক্ষে বসে সাধারণ কোনো অ্যাসাইনমেন্ট দিলে সে কয়েক মিনিটের মধ্যে এআই ব্যবহার করে উত্তর তৈরি করে জমা দিতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী এআই থেকে পাওয়া দীর্ঘ উত্তর পড়ার ধৈর্যও রাখে না। না বুঝেই কপি-পেস্ট করে জমা দেয়। ফলে সে কী লিখছে, সেটিও জানে না। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবী—সবাই যখন এআই ব্যবহার করছেন, তখন শিক্ষার্থীদের জন্য এটি নিষিদ্ধ করে লাভ কী? বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শেখানো প্রয়োজন। তা না হলে তারা প্রযুক্তির ওপর কর্তৃত্ব অর্জনের বদলে এর দাসে পরিণত হবে।
তবে এআই কোন পর্যায়ে এবং কীভাবে শিক্ষায় ব্যবহার করা উচিত, তা নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। শিশু-মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষা গবেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আমাদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় নেই। রাষ্ট্র যদি নিজস্ব জ্ঞান উৎপাদন ও সক্ষমতা তৈরির প্রয়োজন অনুভব না করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে না। ভবিষ্যতে আমাদের মতো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টিকে থাকবে কিনা, সেটিও প্রশ্ন। বিশেষ করে কী ধরনের দক্ষ জনশক্তি আমরা তৈরি করছি এবং তাদের আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে কীভাবে কাজে লাগানো যাবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে।
কেউ চারুকলা বা পেইন্টিংয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে আপনার পরামর্শ কী?
প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব বাস্তবতা, অভিজ্ঞতা ও সময় রয়েছে। তাই সবার জন্য একই পরামর্শ দেওয়া কঠিন। আমি শুধু মনে করি, একজন মানুষকে নিজের মতো করে পৃথিবীকে দেখতে শেখানো জরুরি।
আমরা শিশুদের অনেক বেশি অনুসারী বানাই। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তাদের বলা হয়, অনুসরণ করো, নির্দেশ মেনে চলো। ফলে প্রশ্ন করাটাই তাদের কাছে সাহসের কাজ হয়ে দাঁড়ায়। কেউ প্রশ্ন করলে তাকে অনেক সময় বেয়াদব বলা হয়। বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তৈরি না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই প্রশ্ন করার সাহস অর্জন করে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। শিল্পচর্চার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্পীকে নিজের চোখে পৃথিবী দেখতে হয়, নিজের মতো করে ভাবতে হয় এবং প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে হয়।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, শিল্পের বাজার এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে, তা কাটাতে নীতিনির্ধারকদের কী করা উচিত?
নীতিনির্ধারকদের উচিত সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বসা এবং তাদের কাছে জানতে চাওয়া, কী প্রস্তাব রয়েছে, কীভাবে পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে তার আগে প্রশ্ন করতে হবে, নীতিনির্ধারক কে হবেন এবং তাঁকে নির্ধারণ করবেন কারা?
যাঁরা আন্তরিকভাবে চান এ দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় হোক, জ্ঞান উৎপাদন করুক এবং মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকুক, তাঁদেরই এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা উচিত।















