পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য-জ্বালানি নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে বিমসটেককে আরো কার্যকর আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে চায় বাংলাদেশ।
আজ সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন (বিমসটেক) মহাসচিব ইন্দ্রা মনি পান্ডে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি আ ন ম মুনীরুজ্জামানের সভাপতিত্বে এতে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন বিআইআইএসএস-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান। সেমিনারে মূল্য বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির। এছাড়াও উক্ত সেমিনারে প্যানালিস্ট হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ উজ জামান।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ বাস্তবায়নভিত্তিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য ও ব্লু ইকোনমিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।
তিনি আরো বলেন, তিন দশকের পথচলায় বিমসটেক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা এখন বিলাসিতা নয়, বরং অপরিহার্য।
বাংলাদেশের চেয়ারম্যানশিপ তিনটি নীতির ওপর পরিচালিত হবে—বাস্তবায়ন, বর্জনের পরিবর্তে অন্তর্ভুক্তি এবং ঘোষণার পরিবর্তে ফলাফল। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন এবং ব্লু ইকোনমি খাতের নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে বলেও জানান তিনি।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিমসটেক এফটিএ চুক্তিগুলো সম্পন্নে ঐকমত্য গড়ে তুলে আলোচনায় নতুন গতি আনার পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযোগ, জ্বালানি, ডিজিটাল সংযোগ এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে সদস্যদেশগুলোর সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী।
বিমসটেকের মহাসচিব ইন্দ্রা মনি পান্ডে বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার গুরুত্ব কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিমসটেকের একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও বিস্তৃত খাতভিত্তিক সহযোগিতা রয়েছে। পরিবহন সংযোগ, কৃষি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান চেয়ারম্যানশিপে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরো এগিয়ে নেওয়ার এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
বিআইপিএসএস প্রেসিডেন্ট আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, আজকের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে কোনো রাষ্ট্র এককভাবে টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। বাংলাদেশের জন্য বিমসটেক একটি কৌশলগত সুযোগ, যা বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও ব্লু ইকোনমিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে দেশকে আঞ্চলিক হাবে পরিণত করতে পারে।
এছাড়া, বিআইআইএসএস মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ারম্যান এবং সচিবালয়ের আয়োজক দেশ হওয়ায় সংস্থাটিকে আকাঙ্ক্ষামূলক আঞ্চলিকতা থেকে কার্যকর ও কৌশলগত জোটে রূপান্তরের একটি অনন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সভায় বিআইআইএসএসের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির বলেন, প্রায় ১৭৮ কোটি মানুষের ৫ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির বিমসটেক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্তকারী একটি অনন্য আঞ্চলিক জোট।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন এবং ব্লু ইকোনমি খাতের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে ২০০৪ সালে শুরু হওয়া বিমসটেক এফটিএ এখনো সম্পন্ন হয়নি। বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ এফটিএ সম্পন্নে নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ, কানেক্টিভিটি মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন এবং আঞ্চলিক ভ্যালু চেইন জোরদারে নেতৃত্ব দিতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ উজ জামান বলেন, সংযোগ বিমসটেকের অগ্রগতির চালিকাশক্তি হলেও এর ভিত্তি নিরাপত্তা। রোহিঙ্গা সংকট, মিয়ানমারের পরিস্থিতি, মাদক ও মানবপাচার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো আন্তঃসীমান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা আরো জোরদার করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, অবকাঠামো ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলবায়ু এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বিমসটেকের কার্যক্রম আরো জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সদস্যদেশগুলোর গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম ও অন্যান্য অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি আরো শক্তিশালী করা উচিত।










