বাংলাদেশ থেকে চালের রফতানি এখন বাড়তির দিকে। স্বল্প পরিসরে হলেও এক বছরের ব্যবধানে পণ্যটির রফতানি বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। ব্যবসায়ীদের রফতানি বাড়ানোয় উৎসাহ দিতে প্রণোদনা হিসেবে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পণ্যটি রফতানিতে ১৫ শতাংশ ভর্তুকির ঘোষণা দেয়া হয়েছে গত সপ্তাহেই। সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে ঢাকার বিভিন্ন দূতাবাসের হাইকমিশনার ও রাষ্ট্রদূতদের চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সুগন্ধি চাল আমদানির অনুরোধ জানিয়ে অস্ট্রেলীয় ও কানাডীয় হাইকমিশনারকে চিঠি পাঠিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।
অস্ট্রেলীয় হাইকমিশনার জেরেমি ক্রিস্টোফার কোর্টনারি ব্রয়েরের কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলামতী ও চিনিগুঁড়া চাল আমদানির জন্য দেশটিকে অনুরোধ জানান পররাষ্ট্র সচিব।
দেশের ধান-চাল উৎপাদনে সফলতার কথা জানিয়ে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে এখন প্রায় ৩ কোটি ৮৭ লাখ টন চাল উৎপাদন হচ্ছে। দেশের ১৬ কোটি ৭০ লাখ জনগণের চাহিদা মিটিয়ে এখন দেশে প্রায় ৪০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত আছে। বাংলাদেশ এখন দানাদার খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এখানে ধানের ঘাত, লবণাক্ততা, জলমগ্নতা, খরা ও ঠাণ্ডাসহিষ্ণু জাত রয়েছে। পাশাপাশি ১৩টি প্রিমিয়াম জাতের চাল উৎপাদন হচ্ছে। এছাড়া পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতও রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি জাত জিংকসমৃদ্ধ এবং তিনটি জাত ডায়াবেটিস রোগীর জন্য স্বল্প জিআইসমৃদ্ধ।
এতে আরো বলা হয়, বিশ্বে ধানের গড় ফলনের দিক থেকে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে শীর্ষস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সত্তরের দশকে এ দেশে ধানের ফলন ছিল হেক্টরপ্রতি দুই টনেরও নিচে। বর্তমানে ধানের ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় পাঁচ টন। ধানের ফলন দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে এবং বিশ্বমানের কাছাকাছি।
এছাড়া কানাডার হাইকমিশনারকেও এ নিয়ে চিঠি দেয়ার পাশাপাশি দেশটির কৃষিবিষয়ক উপমন্ত্রী সম্প্রতি বাংলাদেশে এলে তার কাছেও সুগন্ধি চালের দুটি নমুনা দেয়া হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী এপ্রিলে কানাডায় অনুষ্ঠিত কৃষিবিষয়ক মেলায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণও পেয়েছে বাংলাদেশ। সেখানে সুগন্ধি চালের বিপণন প্রসারের প্রয়াস নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পররাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে দেশে চালের চাহিদা ছিল ৩ কোটি ৪৭ লাখ টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮৭ লাখ টন। উদ্বৃত্ত রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ টন। উৎপাদনে এ সফলতায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ধানের ১০০টি জাত উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির সুগন্ধি জাত রয়েছে ১৩টি। এর মধ্যে দুটি বিশেষ জাত বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। জাত দুটি হলো ব্রি ধান৩৪ (চিনিগুঁড়া) ও ব্রি ধান৫০ (বাংলামতী)।
সুগন্ধি জাত দুটির মধ্যে ব্রি ধান৫০ থেকে উত্পন্ন বাংলামতী চালের মান বাসমতীর মতো। ভাত ঝরঝরে। এতে প্রোটিনের পরিমাণ ৮ দশমিক ২ শতাংশ। বোরো মৌসুমের একমাত্র সুগন্ধি জাত এটি। অন্যদিকে সুগন্ধি ও কালিজিরা ধানের মতোই ছোট এবং পোলাও তৈরির দারুণ উপযোগী জাত হলো ব্রি ধান৩৪ থেকে উত্পন্ন চাল চিনিগুঁড়া। ব্রি ধান৩৪-এর আবাদ হয় আমন মৌসুমে। পোলাও চালের জন্য উৎপাদিত স্থানীয় ধানের চেয়ে দ্বিগুণ ফলন দেয় এটি। পররাষ্ট্র সচিবের চিঠিতে এ দুই জাতের চাল আমদানির জন্যই বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়।
এ বিষয়ে ব্রি মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে সরু ও সুগন্ধি প্রিমিয়াম কোয়ালিটির এমন অনেক ধানের জাত রয়েছে, যেগুলোর চাল দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব। ব্রি উদ্ভাবিত এ ধরনের দুটি জাতের চালের কিছু নমুনা বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাস ও হাইকমিশনে উপহার হিসেবে পাঠানোর উদ্দেশ্যে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের কাছে হস্তান্তর করেছি। আমরা মনে করেছি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলে দেশের এ সুগন্ধি চাল বিদেশে রফতানি বাড়ানো সহজ হবে। তাছাড়া এ চাল রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা যেমন অর্জন করা সম্ভব হবে, তেমনি দেশের ব্র্যান্ডিংও সম্ভব হবে।
দুই বছর ধরে চাল রফতানিতে বেশ ঊর্ধ্বমুখী ভাব রয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে পণ্যটি রফতানি করে দেশের আয় হয় প্রায় ৬০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে তা ১৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চাল রফতানি হয়েছে প্রায় আড়াই গুণ। এসব চাল মূলত দেশের বেশকিছু প্রক্রিয়াকারী কোম্পানি বিদেশের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় রফতানি করে থাকে। তবে ভর্তুকি সুবিধা ও দূতাবাসগুলোর সহযোগিতা পেলে বিদেশের বড় বড় সুপারশপসহ প্রধান বাজারগুলোয় রফতানি করা সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পণ্যটি রফতানিতে উৎসাহ বাড়াতে এরই মধ্যে ভর্তুকি সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রফতানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে দেশে উৎপাদিত ধান থেকে আবাদকৃত চাল রফতানির বিপরীতে ভর্তুকি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সুবিধা প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে জাহাজীকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং রফতানি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হলেও দেশে এখনো চাল আমদানি হচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ ৫ হাজার ৭৯০ টন চাল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে সরকারিভাবে আমদানি হয়েছে ৭০ হাজার ৩৫০ টন। বাকি ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪৪০ টন চাল আমদানি হয়েছে বেসরকারিভাবে।
বর্তমানে সরকারিভাবে চাল আমদানি বন্ধ রয়েছে। এর পরও চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে চাল আমদানি হয়েছে ৩ হাজার ৯৪০ টন। এর পুরোটাই হয়েছে বেসরকারিভাবে।









