কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে কয়েক দিন ধরেই দেশে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। গাজীপুরে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনায়। অবশ্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসব ঘটনার সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত নয়। তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেছেন। তবে দুদিন হলো পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। তবু জনমনে আতঙ্ক কাটেনি। পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি যানবাহন চলাচল।
গতকাল সকাল থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে কোনো বাস চলাচল করতে দেখা যায়নি। তবে কিছু কিছু লোকাল পরিবহন চলাচল করছে। জরুরি প্রয়োজনে যারা বের হচ্ছে তাদের প্রধান অবলম্বন অটোরিকশা। নিরাপত্তার স্বার্থে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে বসেছে পুলিশের চেকপোস্ট। সবাইকে তল্লাশি করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
গাজীপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের উত্তাপ ছড়ায় ১৮ জুলাই থেকে। তবে সে আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয় ১৯ জুলাই দুপুরের পর থেকে। সেদিন দুপুরে শহরের রাজবাড়ী রোডের বিএনপি অফিসের সামনে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল এবং রাবার বুলেট ছুড়লে আহত হন অনেকে। ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এ সময় জেলা শহরে মিছিল বের করেন। অন্যদিকে কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ডুয়েট থেকে মিছিল নিয়ে শিববাড়ী মোড়ে অবস্থান নেন। সেখানে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় শহরের শিববাড়ী, বাসস্ট্যান্ড, নেয়ামত সড়ক, ডুয়েট, চন্দনা চৌরাস্তা, গাছা, বোর্ড বাজার, বড়বাড়ী ও টঙ্গী এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। টানা দুদিন সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো গাজীপুর।
পরদিন শনিবার সকাল থেকেই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে পুরো জেলায়। ডুয়েটের পাশে ভুরুলিয়া এলাকায় মৈত্রী ট্রেন আটকে দেন ডুয়েটের শিক্ষার্থীরা। তারা মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে পুলিশ তাদের ঘেরাও করে রাখে। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে তারা মিছিল নিয়ে জেলা শহর প্রদক্ষিণ করে শিববাড়ী এলাকায় অবস্থান নেন দুপুরের পর। সেখানে আগে থেকেই মোতায়েন করা পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং এক পর্যায়ে সংঘর্ষ ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। রাত ৮টা পর্যন্ত শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুলিশ ১০-১৫ জনকে আটক করে। আহত হন অন্তত ৩০ জন। জয়দেবপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায়ও ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।
চৌরাস্তা, গাছা, বোর্ড বাজার এবং টঙ্গী এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয় পুলিশের সঙ্গে। সংঘর্ষে শিক্ষার্থীরা ছাড়াও অতিউৎসাহী কিছু লোক পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। আগুন দেয়া হয় চারটি পুলিশ বক্সে। পুড়িয়ে দেয়া হয় অর্ধশত গাড়ি৷। হামলা করা হয় সড়ক ভবন, টঙ্গী ডেসকো, টঙ্গী থানাসহ সরকারি অনেক স্থাপনায়। হামলাকারীরা গাছা থানায় কয়েকবার হামলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এখানে রায়হান নামে এক কিশোর মারা যায়। আহত হয় অনেক। গাজীপুর চৌরাস্তার তেলিপাড়ায় মারা যায় নুরুল আমিন নামে একজন। গাজীপুর শহরে গুলিবিদ্ধ হয় এক শিশু। শনিবার রাতে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জায়েদা খাতুনের বাসভবনে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। তারা বাসার মূল ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। খবর পেয়ে পুলিশ মেয়রকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। তবে গত রোববার থেকে গাজীপুরের কোথাও নতুন করে হামলা বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করে রাখা হয়।
এদিকে এসব সহিংসতায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন সদর, বাসন, পুবাইল, গাছা, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, টঙ্গী পূর্ব ও পশ্চিম থানায় ২৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখসহ প্রায় ১৫ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় গত দুদিনে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে ৭০ জনকে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মাহবুব আলম জানান, যারা সহিংসতা করেছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।










