দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে পাঁচ-ছয়টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় নদী পারাপার হতে হচ্ছে শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ যাত্রীদের। সন্ধ্যা নামলে নৌকা চলাচল বন্ধ হলেই কার্যত যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এলাকাটি। উপজেলার ধরখার ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামে নদীটির ওপর সেতুটি অবস্থিত। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে এক কংক্রিটের কঙ্কাল। সেতুর মাঝখানে বিশাল ফাঁকা জায়গা রয়ে গেছে। দুই পাশে কোনো সংযোগ সড়কও নেই।

স্থানীয়রা জানান, সেতুটি চালু হলে কৃষ্ণনগর, ভবানীপুর, বনগজ ও বরিশলসহ আশপাশের গ্রামগুলোর দীর্ঘদিনের কষ্ট দূর হতো। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষিপণ্য পরিবহনে স্থানীয়দের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

জানা গেছে, আধুনিকতার এ যুগে মানুষের জীবন থমকে আছে দীর্ঘ অপেক্ষায়। মারাত্মক অসুস্থ রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে নেয়া সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে টুকরিতে চেপে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হয়। এরপর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিক্রম করতে হয় তিতাস নদ। নৌকা চলাচলই স্থানীয়দের পারাপারের একমাত্র ভরসা। তবে সন্ধ্যার পর নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন পুরো এলাকা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

শিক্ষার্থীরাও এর বড় শিকার হচ্ছে। স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষার্থী জানায়, সময়মতো নৌকা না পেলে তাদের খুব কষ্ট হয়। অনেক সময় তারা সময়মতো পরীক্ষা দিতে পারে না।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, নদী পার হতে গিয়ে অতীতে অনেক ছাত্র-ছাত্রী মারা গেছে। তাই ভয়ে অনেক শিশু এখন আর স্কুলে যেতে চায় না। অন্য এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, নারী ও শিশুদের নিয়ে নদী পার হওয়া খুব কঠিন। তিনি দ্রুত সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি জানান।

আখাউড়া উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের অক্টোবরে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। সরকারি অর্থায়নে ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মিত হচ্ছে। ২০৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ছয় মিটার প্রস্থের সেতুটির কাজ ২০২৩ সালের মার্চের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় ‘মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তারা এরই মধ্যে চার দফায় কাজের মেয়াদ বাড়িয়েছে। এখন তারা পঞ্চমবারের মতো সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে।

সরজমিনে দেখা যায়, সেতুর মাঝখানের প্রায় ৪০ মিটার স্প্যান এখনো বসানো হয়নি। এছাড়া ওপরের অংশ ও দুই পাশের অ্যাপ্রোচ সড়কও অসমাপ্ত পড়ে আছে।

বিলম্বের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মো. খায়রুল হাসান জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ছাড়পত্র এবং ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণেই কাজ পিছিয়ে গেছে।

তবে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান জানান ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটির লোকবল ও নির্মাণসামগ্রীর সংকটের কারণে দীর্ঘদিন এ প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। এখন পর্যন্ত ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত চিঠি দিয়েছি যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেয়া হবে।’

আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া জানান, বিভিন্ন অভিযোগ থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সেতুটি দ্রুত নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পুনরায় চিঠি দেয়া হয়েছে।