রাজশাহীর বাসিন্দা সামেলা খাতুন (ছদ্মনাম)। বয়স প্রায় ৬৯ বছর। স্কুলের আয়া হিসেবে কাজ করা এ নারীর আশঙ্কা, বর্তমান বয়স বহাল থাকলে ভবিষ্যতে পেনশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। সে আশঙ্কা থেকেই জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) বয়স প্রায় ১৯ বছর কমিয়ে ৫০ বছর করার আবেদন করেছেন তিনি। আর এ আবেদন নিয়ে একাধিকবার রাজশাহী থেকে ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) এনআইডি অনুবিভাগে ছুটে আসতে হয়েছে তাকে। কিন্তু আবেদনের সঙ্গে থাকা নথিপত্রের অসংগতি ও পারিবারিক তথ্যের রয়েছে নানা গরমিল।

ইসি কর্মকর্তাদের যাচাইয়ে দেখা গেছে, সামেলার বর্তমান এনআইডিতে জন্মতারিখ ৬ নভেম্বর ১৯৫৭। তিনি সেটি পরিবর্তন করে ১৮ জানুয়ারি ১৯৭৬ করতে চান। এতে তার বয়স দাঁড়াবে ৫০ বছর। কিন্তু এ পরিবর্তন অনুমোদন করা হলে নিজের বড় সন্তানের চেয়েও ছোট হয়ে যাবেন এ নারী। তার বড় ছেলের এনআইডিতে জন্ম সাল ১৯৬৯। অর্থাৎ প্রস্তাবিত জন্মতারিখ অনুযায়ী ছেলের বয়স হবে ৫৭ বছর, আর মায়ের বয়স ৫০ বছর!

সামেলার ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়। এনআইডিতে বানান বা ঠিকানা সংশোধনের মতো সাধারণ ভুলের তুলনায় জন্মতারিখ বা বয়স পরিবর্তনের আবেদন এখন নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিদেশে যাওয়ার জন্য বয়স বাড়িয়ে এনআইডি তৈরি, পরবর্তী সময়ে পাসপোর্ট ও শিক্ষাগত সনদের সঙ্গে মিলাতে বয়স কমানোর চেষ্টা, চাকরির মেয়াদ বাড়ানো কিংবা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সুবিধা নেয়ার প্রবণতা থেকে এ ধরনের আবেদনের বড় অংশ আসছে। এসব আবেদনের সঙ্গে শিক্ষাগত সনদ, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট ও পারিবারিক তথ্যের গরমিল থাকায় বিপুলসংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না।

এনআইডিতে তথ্য পরিবর্তন করতে ইসি কার্যালয়ে এসেছিলেন শরীয়তপুরের ইতালি প্রবাসী তবারক পাটোয়ারী (ছদ্মনাম)। তার বর্তমান এনআইডিতে জন্মতারিখ ১৫ এপ্রিল ১৯৮৭ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক পাস। কিন্তু সংশোধনের আবেদনে তিনি জন্মতারিখ ১০ জুন ১৯৯৭ করার পাশাপাশি শিক্ষাগত যোগ্যতা সপ্তম শ্রেণী দাবি করেছেন। ২০০৭ সালে ভোটার হিসেবে জাতীয় ডেটাবেজে নিবন্ধিত হন। যদিও প্রস্তাবিত জন্মতারিখ অনুমোদন হলে ২০০৭ সালে ভোটার হওয়ার সময় তার বয়স দাঁড়ায় মাত্র ১০ বছর!

এ আবেদনের সঙ্গে থাকা নথিতেও অসংগতি রয়েছে। ২০০৭ সালে ভোটার হলেও বয়স সংশোধনের জন্য তিনি ২০১৮ সালের জন্মসনদ এবং ২০২৪ সালের পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। একই সঙ্গে পিতার নাম সংশোধনের আবেদন করলেও তার পক্ষে যথাযথ দলিল দেননি।

একই জেলার আরেক ইতালি প্রবাসী মুসা আজম (ছদ্মনাম) তার বয়স সাত বছর বাড়ানোর আবেদন করেছেন। বর্তমান এনআইডিতে জন্মতারিখ ১ এপ্রিল ১৯৯৪। সেটি পরিবর্তন করে তিনি ১ এপ্রিল ১৯৮৭ করার আবেদন দিয়েছেন। কিন্তু ইসি ডেটাবেজ অনুযায়ী তার মায়ের জন্ম সাল ১৯৭৭। প্রস্তাবিত জন্ম সাল অনুযায়ী মা ও ছেলের বয়সের ব্যবধান দাঁড়াবে কেবল ১০ বছর। এর সঙ্গে রয়েছে নথির অসংগতিও। ২০১৩ সালে ভোটার হওয়ার পর তিনি ২০১৭ সালে তৈরি জন্মসনদ ও ২০২২ সালের পাসপোর্ট দিয়ে বয়স পরিবর্তনের দাবি করেছেন।

ইসি কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের আবেদনের পেছনে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে বয়সসীমা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক ভিসায় যাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন বয়স ২১ বছর এবং সর্বোচ্চ ৪৫ বছর; দ্বিতীয়বার যাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়স ৫০ বছর। অনেক ক্ষেত্রে ১৬-১৭ বছরের কিশোরকে পরিবার বা দালালের মাধ্যমে বয়স বাড়িয়ে ২১ বছর দেখিয়ে এনআইডিতে নিবন্ধনের ঘটনা ঘটে। বিদেশে গিয়ে কয়েক বছর কাজ করার পর দেশে ফিরে কিংবা অন্য কোনো সুবিধা নেয়ার সময় তারা প্রকৃত বয়সের সঙ্গে মিল থাকা এসএসসি সনদ সামনে এনে আবার বয়স কমানোর আবেদন করেন।

ফরিদপুর ও সিলেট অঞ্চলে প্রবাসীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এ ধরনের বয়স সংশোধনের আবেদনও তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে দেশের অন্য অঞ্চলগুলোয়ও এমন আবেদন কম নয়।

এনআইডি অনুবিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত আগস্ট পর্যন্ত এনআইডি সংশোধনের ৬৫ লাখ আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে প্রায় দেড় লাখ সংশোধন আবেদন নির্বাচন কমিশনে জমা রয়েছে। এর ৬০-৭০ শতাংশই জন্মতারিখ বা বয়স পরিবর্তনসংক্রান্ত। এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার আবেদন রয়েছে মহাপরিচালকের আওতাধীন ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে, যা কেবল নির্বাচন কমিশনের এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায় থেকে নিষ্পত্তি করা হয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, এ ক্যাটাগরির অনেক আবেদনে বয়সের এমন পরিবর্তন চাওয়া হচ্ছে, যা পারিবারিক ধারাবাহিকতা ও স্বাভাবিক জীববৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সঙ্গেও মেলে না। কোথাও আবেদনকারীকে তার নিজের সন্তানের চেয়ে ছোট হয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে, আবার কোথাও নাবালক বয়সে ভোটার হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ড. কাজী জাহেদ ইকবাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টে তথ্য পরিবর্তন বা বয়স কমানোর উদ্দেশ্যে জাল কাগজপত্র তৈরি ও ব্যবহার জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন ও দণ্ডবিধির অধীনে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। অপরাধের ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতে এর জন্য বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তির বিধান রয়েছে।’

মানবাধিকার ও আইনগত সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) প্যানেল আইনজীবী ও উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকারি নথি, এনআইডি সংশোধন বা আদালতের এফিডেভিটের মতো আইনি প্রক্রিয়ায় বয়সের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে কম দেখানোর মতো ঘটনা নিছক তথ্যগত ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এ ধরনের জালিয়াতির পেছনে কোনো ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।’

কাজী জাহেদ ইকবালের মতে, জাতীয় ডেটাবেজ ও এনআইডির তথ্য ইচ্ছামতো পরিবর্তনের প্রবণতা শুধু প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করছে না, এর প্রভাব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। একই ব্যক্তির বয়স, নাম বা পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য এনআইডি, পাসপোর্ট ও অন্যান্য নথিতে ভিন্ন হলে বিদেশে ভ্রমণ, শিক্ষা, চাকরি কিংবা অভিবাসনের ক্ষেত্রে যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে জালিয়াতিতে জড়িত না থাকা সাধারণ নাগরিককেও বাড়তি যাচাই ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অল্পসংখ্যক ব্যক্তির জালিয়াতির কারণে যেন সাধারণ শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও পর্যটকদের বিদেশের ইমিগ্রেশনে অনাস্থা বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখে পড়তে না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

বয়স সংশোধনের জটিলতা আরো বাড়িয়েছে পুরনো পাসপোর্টের সঙ্গে এনআইডির তথ্যের গরমিল। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০১৪-১৯ সালের মধ্যে পাসপোর্ট অধিদপ্তর এনআইডি ডেটাবেজ সরাসরি যাচাই না করে স্থানীয় জন্মসনদের ভিত্তিতে বিপুলসংখ্যক মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) ইস্যু করেছে। বর্তমানে ই-পাসপোর্টের ক্ষেত্রে এনআইডি তথ্য বাধ্যতামূলক হওয়ায় পুরনো পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে বর্তমান এনআইডির অসংগতি সামনে আসছে।

প্রবাসীদের অনেকে তখন পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে মিল রেখে এনআইডি সংশোধনের আবেদন করছেন। তবে এক্ষেত্রে ইসির অবস্থান কঠোর। কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় ডেটাবেজই হবে মূল ভিত্তি। পাসপোর্টে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে এনআইডি পরিবর্তন করা হবে না; বরং প্রয়োজন হলে পাসপোর্টের তথ্য এনআইডির সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।

অস্বাভাবিক বয়স সংশোধনের আবেদন ঠেকাতে এখন সংশোধনের ক্ষেত্রে আরো কঠোর যাচাই করছে নির্বাচন কমিশন। ১৯৯৬ সালের পরের এসএসসি ও ১৯৯৮ সালের পরের মাদরাসার সনদ অনলাইনে যাচাই করা গেলেও ১৫ বছর বা তার বেশি বয়স কমানোর ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষাগত সনদের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে না। আবেদনকারীর পারিবারিক সম্পর্ক ও বয়সের ধারাবাহিকতাও যাচাই করা হচ্ছে।

এক্ষেত্রে ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক ধারাবাহিকতা যাচাইকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কোনো আবেদনকারী নিজের সন্তানের চেয়ে ছোট হয়ে যাচ্ছেন কিনা, মা-বাবা ও সন্তানের বয়সের ব্যবধান অস্বাভাবিক কিনা কিংবা ভাইবোনদের জন্মক্রমের সঙ্গে নতুন বয়সের তথ্য সাংঘর্ষিক কিনা—এসব তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে পিতা-মাতার এনআইডি, ভাইবোন ও সন্তানের এনআইডি নম্বর, পিতা মৃত হলে ওয়ারিশ সনদ এবং পিতা জীবিত থাকলে পারিবারিক সনদ চাওয়া হচ্ছে। এছাড়া বড় ধরনের জন্মতারিখ পরিবর্তন, বয়স কমানোর সঙ্গে সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তন এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদসংক্রান্ত আবেদন উপজেলা পর্যায়ে নিষ্পত্তি না করে মহাপরিচালকের ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে পাঠানো হচ্ছে।

ভবিষ্যতে নতুন ভোটার নিবন্ধন এবং ১৫ বছর পরপর এনআইডি নবায়নের সময় পিতা-মাতা, ভাইবোন ও সন্তানের তথ্য যুক্ত করে একটি ‘ফ্যামিলি ট্রি’ ক্লাস্টার ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া যাতে ডিজিটাল সিস্টেমে আবেদন জমা দেয়া না যায়, সেজন্য ফিল্টারিং ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে। ক্যাটাগরি অনুযায়ী আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘ঘ’ ক্যাটাগরির আবেদনের ক্ষেত্রে ৩০ দিন এবং মহাপরিচালকের অনুমোদন প্রয়োজন এমন আবেদনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪৫ দিনের সময়সীমা রাখা হয়েছে।

ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ নিয়ে নির্বাচন কমিশন কাজ করছে। “ফ্যামিলি ট্রি” এ প্রক্রিয়াকে সহজ করার পাশাপাশি পারিবারিক তথ্যের সামঞ্জস্য যাচাইয়ে সহায়তা করবে। এটি হঠাৎ নেয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; পরিকল্পিতভাবেই উদ্যোগটি নেয়া হয়েছে।’