যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে রয়েছে অন্যতম প্রধান গম উৎপাদনকারী দেশ রাশিয়া-ইউক্রেন। তাদের মিত্রদেশগুলোর মধ্যেও ছড়িয়েছে এর উত্তেজনা, যার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে। তবে দেশের বাজারে গমের দাম বাড়ছে সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের অজুহাতে। যদিও এ দুটি দেশ থেকে এখন বাংলাদেশে গম আমদানির পরিমাণ সামান্যই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ গম আমদানি হয় ভারত থেকে।
দুই সপ্তাহের ব্যবধানে গমের পাইকারি বাজারে দাম বেড়েছে মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ৭০-৮০ টাকা। ভারত থেকে আমদানি হওয়া গম বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০৫ টাকায়। কয়েক সপ্তাহ আগেও একই মানের গম বিক্রি হতো ১ হাজার ২৫ থেকে ১ হাজার ৩৫ টাকায়। এছাড়া এ সময়ে কানাডা থেকে আমদানি হওয়া গমের দাম মণপ্রতি ৩০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়।
খাতুনগঞ্জের মেসার্স শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইসহাক বণিক বার্তাকে বলেন, পাইকারি বাজারে গমের খুব একটা ট্রেডিং হয় না। দেশের সিংহভাগ গম আমদানি করে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো। এছাড়া সরকারও বড় অংকের গম আমদানি করে। ছোট-বড় ফ্লাওয়ার মিলগুলোর গমের প্রয়োজন হলে বড় আমদানিকারকদের কাছ থেকে বাজারমূল্যে সংগ্রহ করে নেয়। তবে স্থানীয় পর্যায়ে গমের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংকটে পড়েছে বিভিন্ন ফ্লাওয়ার মিল। বড় কোম্পানিগুলো এক দফা আটা-ময়দার দাম বাড়ালেও ফ্লাওয়ার মিল মালিকরা এখনো সেভাবে দাম বাড়াতে পারেননি। বর্তমানে গমের দাম নতুন করে বাড়তে শুরু করায় গম বেচাকেনা আগের চেয়ে কমে এসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য চালের পর গমের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। আগে গমের ব্যবহার কম থাকলেও গত এক দশকে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কারণে দেশে গমের চাহিদাও বেড়েছে, যার কারণে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গম আমদানি প্রতি বছরই বাড়ছে। একসময় ৩০-৪০ লাখ টন গম আমদানি হলেও বর্তমানে তা ৬০ লাখ টন ছাড়িয়েছে। দেশে মাত্র ১০ লাখ টনের কাছাকাছি গম উৎপাদন হওয়ায় আমদানির ওপর নির্ভরশীলতার কারণে গমের বৈশ্বিক দর পরিবর্তন বাংলাদেশেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
জানা গেছে, একসময় কানাডা ও রাশিয়া-ইউক্রেনের গমের ওপর নির্ভরশীল ছিল দেশের বাজার। তবে কয়েক বছর ধরে দেশে ভারতীয় গমের চাহিদা বাড়ছে। মূলত আমদানি প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি আমদানি খরচ কম থাকায় ভারত থেকে গম আমদানিতে বেশি সাশ্রয় হয় ব্যবসায়ীদের। তাছাড়া সময় কম লাগে বলে অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতের গমের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে আমদানিকারকদের। প্রতি মাসেই ভারত থেকে লক্ষাধিক টনের বেশি গম আমদানি হয় দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে। তবে দুই মাস আগে ভারতীয় গমের দাম কমলেও সম্প্রতি আবারো বাড়তে শুরু করেছে। মূলত রাশিয়া-ইউক্রেনের সংকটের কারণে বৈশ্বিক গমের বুকিং বেড়ে গেছে। এতে চাপ পড়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে। দেশে বর্তমানে ভারত থেকেই সবচেয়ে বেশি গম আসে, যা বাংলাদেশের মোট চাহিদার ৬০-৭০ শতাংশ। বাকি গম আমদানি হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও আর্জেন্টিনা থেকে। বর্তমানে ভারতীয় গম আমদানি হচ্ছে টনপ্রতি ৩২০-৩২৫ ডলারে (সড়কপথে স্থলবন্দর দিয়ে)। অন্যদিকে জাহাজে করে আসা গমের দাম পড়ছে ৩৪৫-৩৫০ ডলার। এছাড়া কানাডা-অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানীকৃত গমের টনপ্রতি দাম পড়ছে ৪৪০-৪৫০ ডলার। হঠাৎ করে ভারতীয় গমের চাহিদা বাড়ায় ওই দেশের দামও কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন আমদানিকারকরা।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বণিক বার্তাকে এ প্রসঙ্গে বলেন, শিপিং চার্জ বৃদ্ধি ছাড়াও বৈশ্বিক ভোগ্যপণ্য রফতানি বাণিজ্যের প্রেক্ষাপট বেশ কিছুদিন ধরে পরিবর্তন হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে গম আমদানি এক বছর ধরে নিম্নমুখী। গত কয়েক মাসে সেটি প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। ফলে বাংলাদেশ নতুন করে ভারতের ওপর নির্ভর করছে ভৌগোলিক ও কম মূল্যে আমদানি সুবিধার জন্য।
তিনি আরো জানান, ব্যবসায়ীরা যেখানে কম পাবেন সেখান থেকেই আমদানি বাড়াবেন। আবার হঠাৎ কোনো স্থান থেকে আমদানি বাড়লে ক্রমান্বয়ে দামও কিছু বাড়ে। ততদিনে অন্য উৎসের অনুসন্ধান করবেন ব্যবসায়ীরা এবং যেখানে কম পাবেন সেখান থেকেই আমদানি করবেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আটা-ময়দা তৈরিতে ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির গমের প্রয়োজন হয়। আটা তৈরিতে কিছুটা নিম্নমানের অর্থাৎ নরম জাতীয় গম ব্যবহার হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন কিংবা ভারতীয় গম দিয়ে আটা তৈরি হয় সবচেয়ে বেশি। তবে ময়দা তৈরিতে ভালো মানের কানাডিয়ান গম প্রয়োজন। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে আমদানির পরিবর্তে ভারত থেকে আনা গম দিয়ে আটা তৈরি করে দেশের কোম্পানিগুলো, যার কারণে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দ্য চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলেছে। তবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এ দুটি দেশ থেকে গম আমদানি হচ্ছে না বললেই চলে। রাশিয়া-ইউক্রেনের পরিবর্তে এখন ভারত থেকে ৮০ শতাংশ গম আমদানি হয়। ভারতীয় গমের দাম কমলেও বর্তমানে কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। এ কারণে যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে বৈশ্বিক দামের প্রভাব দেশে পড়লেও অতটা সংকট তৈরি হবে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে গম আমদানি হয়েছে ৫৪ লাখ ৪৩ হাজার টন। যদিও ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গম আমদানি হয়েছিল ৬৪ লাখ ৩৪ হাজার টন। এছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৫৬ লাখ ২৯ হাজার ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫৮ লাখ ৮১ হাজার টন গম।









