সীমান্ত জটিলতার কারণে দীর্ঘ তিন বছর ধরে আটকে আছে ফেনীর বিলোনীয়া স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নকাজ। ফলে আগামী বছরের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এদিকে কাজ আটকে থাকায় বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়।
ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফের দাবি, বিলোনীয়া স্থলবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য যে স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে, তার ৭০-৭৫ ভাগই নো ম্যান্স ল্যান্ডের (সীমান্তের ১৫০ গজ ভেতরে) অভ্যন্তরে পড়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এ স্থানে বাংলাদেশ কোনো স্থাপনা নির্মাণ অথবা সংস্কার করতে পারবে না।
তবে বিজিবির দাবি, প্রকল্পের ১০ একর জায়গার মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ জায়গা সীমান্তের ১৫০ গজের ভেতরে পড়েছে। বিএসএফ কল্পিত অজুহাত দিয়ে বিলোনীয়া বন্দরের উন্নয়নকাজে বাধা দিচ্ছে। কাজ বন্ধ থাকায় ৩৮ কোটি ৬৪ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ব্যয়ে চলমান প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০০৯ সালের ৪ অক্টোবর দেশের ১৭তম স্থলবন্দর হিসেবে পথচলা শুরু হয় ফেনীর বিলোনীয়া স্থলবন্দরের। তবে একমুখী বাণিজ্যের কারণে বন্দরটি অবকাঠামোগত উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শিরিন আক্তারের প্রচেষ্টায় বন্দরটির অবকাঠামোগত উন্নয়নের পদক্ষেপ নেয়া হয়। পরে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ৩৮ কোটি ৬৪ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ব্যয়ে বিলোনীয়া স্থলবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। ২০১৮ সালের ২০ এপ্রিল বন্দরের আশপাশের ১০ একর জায়গায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাংলাদেশ বন্দর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রকল্পটির কাজ পায় ‘পিবিএল টপ লাইন জিবি’
নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু কাজ শুরুর তিন বছরে প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। বিএসএফের বাধার মুখে বাকি ৭০ ভাগ কাজ করতে পারছে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ওই প্রকল্পের আওতায় ওয়্যারহাউজ, অভ্যন্তরীণ সড়ক, ওপেন ইয়ার্ড, পার্কিং ইয়ার্ড, ট্রান্সশিপমেন্ট শেড, অফিস ভবন, ব্যারাক, ডরমিটরি, ড্রেন, টয়লেট কমপ্লেক্স, ওয়েব্রিজ স্কেল, পানি সরবরাহ, বিদ্যুতায়ন, ওয়াচ টাওয়ার, ফায়ার ফাইটিল স্থাপনকাজ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিন বছর ধরে বিএসএফের বাধার কারণে বাউন্ডারি ও ইয়ার্ড নির্মাণকাজ ছাড়া কিছুই করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিবিএল টপ লাইন জিবির কর্ণধার ফয়সাল হায়দার বলেন, প্রকল্পের আওতায় অন্তত ৭০ ভাগ জায়গা সীমান্তের ১৫০ গজের ভেতরে রয়েছে। ওই স্থানে বিএসএফ নির্মাণকাজ করতে দিচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে বিজিবি-বিএসএফ কয়েক দফায় বৈঠকে বসলেও কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় অনেক নির্মাণসামগ্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়তে থাকায় একদিকে যেমন ব্যয় বাড়ছে অন্যদিকে বাস্তবায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ১৯৭৪ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির মাধ্যমে সীমান্তের ১৫০ গজের ভেতরে স্থাপনা নির্মাণে সম্মত হয় দুই দেশ। এছাড়া ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের এক সমঝোতা চুক্তিতে ফেনীর বিলোনীয়া স্থলবন্দরসহ ১০টি বন্দরের উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রে নো ম্যানস ল্যান্ডের অভ্যন্তরে কাজ করার সম্মতি দেয়া হয়। কিন্তু তা মানছে না বিএসএফ।
বিজিবি ও বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, এ জটিলতার সমাধানের জন্য ২০২০ সালের ১৬ জানুয়ারি নৌ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে নৌ মন্ত্রণালয় থেকে একই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। এর আলোকে চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিজিবির মহাপরিচালককে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। জিরো পয়েন্টের ১৫০ গজের ভেতর উন্নয়ন অবকাঠামো নির্মাণের সম্মতি গ্রহণ করতে এরই মধ্যে বিজিবি-বিএসএফ বৈঠকের জন্য বিজিবির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিএসএফ থেকে আনুষ্ঠানিক সম্মতি পাওয়া না গেলে প্রকল্পটির বাকি কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা।
বিলোনীয়া স্থলবন্দর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. ইব্রাহিম ভূইয়া জানান, প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ করতে না পারায় ঠিকাদার ও বন্দর কর্তৃপক্ষ আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত বন্দর কর্তৃপক্ষের উপসহকারী প্রকৌশলী সাহাব উদ্দিন বচলেন, বর্তমানে প্রকল্পের সীমানা প্রাচীর, কিছু রাস্তা ও ইয়ার্ড নির্মাণরে কাজ শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি ২০-২৫ ভাগের বেশি নয়। বাকি কাজ বিএসএফের বাধার কারণে করা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী-৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আবদুর রহিম জানান, বিলোনীয়া স্থলবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত সাত একর জমি জিরো পয়েন্টের ১৫০ গজের মধ্যে পড়েছে, এমন তথ্য সঠিক নয়। বরং সামান্য একটু জায়গা জিরো পয়েন্টের মধ্যে পড়েছে। বিষয়টি সমাধানে উচ্চপর্যায়ে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করি শিগগিরই এ বিষয়ে সফলতা আসবে।










