ফরিদপুরের কুমার নদে নাব্য ফেরাতে ২৫০ কোটি ৮১ লাখ টাকা একটি প্রকল্প হাতে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রকল্পের আওতায় পুনঃখনন ছাড়াও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের কথা ছিল। প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও নাব্য ফেরেনি নদে। এছাড়া তীরের দুই পাশের অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদ করা যায়নি। পাউবোর হিসাব বলছে, নদের তীরে অন্তত ১ হাজার ৬০০ অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, পুনঃখনন কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। এজন্য কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। নদটি এখনো রয়েছে অবৈধ দখলদারের কবলে। কিছু অংশ পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে।
জানা গেছে, ফরিদপুর সদর উপজেলার ডিক্রিরচর ইউনিয়নের মদনখালীতে পদ্মা নদী থেকে কুমার নদের উৎপত্তি। এটি ফরিদপুর শহরের মধ্য দিয়ে সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী ও ভাঙ্গা উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ১২১ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে গোপালগঞ্জের সেনদিয়ায় আড়িয়াল খাঁ ও মধুমতি নদীর সংযোগ খাল বিলরুট ক্যানেলে গিয়ে মিশেছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, নদের নাব্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্প হাতে নেয়। ২৫০ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ে মূল নদের ৭১ কিলোমিটার অংশ সংস্কার করা হয়। কাজটি খুলনা শিপইয়ার্ড পায়। পরে সেটি সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে বাস্তবায়ন করে বেঙ্গল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ফিউচার ইনফ্রাস্ট্রাকচার। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি নেয়া হলেও কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের এপ্রিলে। পুনঃখনন ছাড়াও গোসলের জন্য নদের বিভিন্ন স্থানে ৬১টি পাকা ঘাট ও নারীদের জন্য ঘাটের পাশে ঘর নির্মাণ করার কথা। পর্যায়ক্রমে নদকে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা ছাড়াও প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ কোটি ঘনমিটার পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার কথা। এতে ২৩ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দিয়ে ৩৪ হাজার ১০৪ হেক্টর টন অতিরিক্ত ধান উৎপাদন হবে বলেও জানিয়েছিল পাউবো। সংস্কারকাজে দখলদার উচ্ছেদ করে নদীটিকে একটি বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল। তবে কাজ শেষেও তীরের দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা যায়নি। নদের দুই পারে শহরের মধ্যে নয় কিলোমিটার অংশে সবচেয়ে বেশি জায়গা দখলদারদের কবলে চলে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, অন্তত ১ হাজার ৬০০ অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে দুই পারে। শহরের মদনখালী রেগুলেটরের কাছে উৎসমুখ থেকে শুরু হয়ে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট পর্যন্ত দখলদারের কবলে রয়েছে। মদনখালী রেগুলেটর, চুনাঘাটা, অম্বিকাপুর, আলীপুর, শরীয়তুল্লাহ বাজার, পশ্চিম খাবাসপুর, পূর্ব খাবাসপুর, চর কমলাপুর ও বিল মামুদপুরে নদের দুই পাশে বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে রেখেছে অবৈধ দখলদাররা।
স্থানীয় বাসিন্দা বিভাষ দত্ত ও ক্যাব ফরিদপুরের সভাপতি শেখ ফয়েজ আহমেদ জানান, কুমার নদ দখল ও দূষণে ভরাট হয়ে যাওয়ায় শহরবাসী দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদে ময়লা-আবর্জনা জমে পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। শহরের ব্যস্ততম এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কুমার নদের ঘাটলাগুলো যেন এখন বাজার ও বাসাবাড়ির আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
ফরিদপুর পৌরসভার মেয়র অমিতাভ বোস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কুমার নদে বাসাবাড়ি ও বাজারের বর্জ্য না ফেলার জন্য আমরা সাইনবোর্ড টাঙিয়েছি। এর পরও যেসব কলকারখানা ও বাসাবাড়ির বর্জ্য নদে ফেলা হচ্ছে, সেগুলোর ব্যাপারেও চেষ্টা চলছে, যাতে এভাবে নদে আবর্জনা ফেলতে না পারে। কিছু প্রভাবশালীর বাসাবাড়ির ড্রেনও এরই মধ্যে বন্ধ করে দিয়েছি। শহরের ড্রেনের মুখগুলোর বিকল্প পথ খুঁজে বের করার বিষয়টিও চিন্তা করা হচ্ছে।’
এদিকে কুমার নদের খননকাজ শেষ হলে ফরিদপুর সদর, নগরকান্দা, সালথা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা এবং পাশের গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর কৃষিজমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে বলে জানিয়েছিল পাউবো। ৩৪ হাজার ১০৪ হেক্টর টন অতিরিক্ত ধানও উৎপাদন হওয়ার কথাও বলেছিল দপ্তরটি। তবে বাস্তবে তা দেখা যায়নি।
নদের দুই পারের চাষীরা জানান, নদের পানি তাদের বিন্দুমাত্র উপকারে আসেনি। নদেই যদি পর্যাপ্ত পানি না থাকে, তাহলে তা দিয়ে কীভাবে চাষাবাদ সম্ভব।
ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক পান্না বালা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কুমার নদ ফরিদপুরবাসীর জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। নদকে ঘিরে আমরা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। পাউবো কয়েকশ কোটি টাকা খরচ করে নদ পুনঃখনন প্রকল্পও হাতে নিয়েছিল। কাজ অসম্পূর্ণ থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আমাদের সে স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফরিদপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নদের তীরে বিভিন্ন অবকাঠামো থাকায় শহরের মধ্যকার দুই কিলোমিটার পুনঃখনন সম্ভব হয়নি। তবে এখানে নাব্য রয়েছে। খনন করতে পারলে প্রশস্ততা বাড়ানো যেত।’
অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যখন উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন আমি ফরিদপুরে ছিলাম না। তাই এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না।’
জেলা প্রশাসক মো. কামরুল আহসান তালুকদার বলেন, ‘নদে যতটুকু পানি রয়েছে, তা ব্যবহার উপযোগী করতে চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কচুরিপানা পরিষ্কার করে দুই তীরের বাসিন্দাদের আবর্জনা ফেলতে নিষেধ করা হয়েছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।’










