বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, বিদ্যুৎ খাতকে সরকার যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছে। বিদ্যমান ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভর্তুকি বজায় রেখে বেশি দূর এগোনো যাবে না। ভারতের আদানি গ্রুপ হোক বা দেশের সামিট গ্রুপ হোক, আমি মনে করি, এদের সঙ্গে পুনরায় দর-কষাকষি (রিনেগোশিয়েট) করতে হবে। এর মাধ্যমে ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব।

আজ সোমবার (১০ জুন) সম্পাদক পরিষদ ও সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ‘অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক এ সেমিনার হয় রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে।

প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু অসঙ্গতি আছে বলে মনে করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের আকার ৮৬ শতাংশ; ১৪ শতাংশ সরকারি। আমাদের হিসাবে ব্যক্তি খাত ঋণ পাচ্ছে ২৪ শতাংশ আর ৭৬ শতাংশ ঋণ পাচ্ছে সরকার। বড় অসঙ্গতি এখানেই, এটা হতে পারে না।

তিনি আরো বলেন, ব্যাংক খাত এত দুর্বল যে আমানতের প্রবৃদ্ধি ভালো নয়। আমানতে প্রবৃদ্ধি ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে না। সেখান থেকে সরকারই যদি ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়, তাহলে আর কী থাকবে?

ব্যাংক খাত নিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংক খাত থেকে টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার টাকা পাচ্ছে না, ব্যবসায়ীরাও পাচ্ছেন না। কেন পাচ্ছে না? এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী কারা?

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি মুদ্রানীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির বিষয়সমূহ চিহ্নিত করে। বাজেট এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ যদি বাজেট বেশি সম্প্রসারণমূলক হয়, তাহলে সেটি মুদ্রনীতিকে ছাপিয়ে যায় এবং ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি বলব, প্রস্তাবিত বাজেট সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কারণ এটি সংকোচিত বাজেট। এটা মুদ্রানীতির সহায়ক হবে। তবে মূল্যস্ফীতি কি কমে আসবে? সেটা বাজেটের দায়িত্ব নয়। বাজেটে কিছু ট্যাক্স কমানো হয়েছে, সেসব দিয়েও মূল্যস্ফীতি কমে আসবে না। মূল্যস্ফীতি চূড়ান্তভাবে কমবে কঠোর মুদ্রানীতি ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের স্থিতিশীলতার মাধ্যমে। এগুলো যদি সফল হয় তাহলে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমি মনে করি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি গ্রহণে বেশ দেরি করেছে। গত মাসে তারা যে পরিবর্তন এনেছে, বাজারভিত্তিক সুদহার করেছে—এটি যদি দুই বা দেড় বছর আগে করা যেত তাহলে আমরা আজ মূল্যস্ফীতি ৪ বা ৫ শতাংশে রাখতে পারতাম। তবে দেরিতে হলেও এর ফল আসবে বলে আমি আশাবাদী, যদি সরকার আগামী এক বছর এ নীতি ধরে রাখতে পারে।

তিনি বলেন, গত ২-৩ মাস ডলারের বিনিময় হার ১১৭ থেকে ১২০ টাকার মধ্যেই আছে। এটা ইতিবাচক। একই সঙ্গে পলিসি রেটের ফলে সুদহার বেড়েছে। আমি মনে করি সুদহার বাড়ার ফলে বিনিময় হার সাপোর্ট পেতে বাধ্য এবং পাবে। আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, বিনিময় হার এখন যেখানে আছে, আগামী কয়েক মাস সেখানেই থাকবে। আমরা যদি এভাবে এটা রাখতে পারি, কোনো হস্তক্ষেপ না করি, তাহলে আমার ধারণা অন্যান্য দেশে আমরা যে চিত্র দেখেছি, আমাদের দেশেও সেই চিত্র বলবৎ হবে; মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। 

তিনি আরো বলেন, এখানে প্রশ্ন আসতে পারে চালের দাম বা সার্বিক মূল্যস্তর কি কমবে। না, সার্বিক মূল্যস্তর কমবে না কিন্তু মূল্যস্ফীতি মূল্যস্তরে পরিবর্তন আনবে। অর্থাৎ দাম কমবে না কিন্তু দামের বৃদ্ধি কমবে। এটা আমাদের বুঝতে হবে। এমনটা হয়ত জানুয়ারি মাস থেকে আমরা আশা করতে পারি। ৬ মাস তো লাগবেই ফল পেতে। সময়টা সরকারকে দিতে হবে। সরকারকেও সেটা বুঝে কাজ করতে হবে। অসহিষ্ণু হলে এ পলিসি বাস্তবায়ন হবে না।

সাড়ে ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি আশাতীত নয় উল্লেখ করেন আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্রে দেখি, তাদেরও মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশে উঠেছিল। অনেক দিন আগেই সেটি ৩ শতাংশে নেমেছে। তারা ২ শতাংশে নামানোর চেষ্টা করছে, পারছে না। আমাদের কিন্তু ২ শতাংশে নামানোর দরকার নাই। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ৫ বা ৬ শতাংশে নামানো। মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ থেকে সাড়ে ছয়ে নামানোর কথা বলা হচ্ছে। অর্থাং সাড়ে তিন শতাংশ কমানো। এটা কঠিন নয়।  এ জন্য দীর্ঘ সময় লাগবে তাও নয়। একটু ধৈর্য ধরতে হবে। ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে এটি অর্জন সম্ভব। আমি মনে করি পয়েন্ট টু পয়েন্ট এটি কমে আসবে আগামী জুনের মধ্যে।

অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক অর্থসচিব ও সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং যুগান্তরের প্রকাশকে সালমা ইসলাম।  স্বাগত বক্তব্য দেন নোয়াব সভাপতি এ. কে. আজাদ। সমাপনী বক্তব্য দেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।